ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ব রাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তিই হলো, পরপর অসংখ্য মিথ্যা বলে প্রতিপক্ষ ও বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করা।
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যমতে, প্রথম মেয়াদে ৩০ হাজারেরও বেশি বিভ্রান্তিকর দাবি করা ট্রাম্প এখন প্রতিদিন গড়ে ২১টি করে মিথ্যা ছড়াচ্ছেন। আর এ মিথ্যার স্রোত এখন আঘাত হানছে গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা এবং ইউক্রেনের মতো তিনটি ভিন্ন মেরুর সংকটে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবিগুলো যেন কোনো কাল্পনিক গল্পের অংশ। তিনি দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজে গ্রিনল্যান্ডের উপকূল ছেয়ে গেছে এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া জরুরি। অথচ ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন নিজেই গ্রিনল্যান্ড সফর করে জানিয়েছেন, সেখানে ট্রাম্পের দাবিকৃত কোনো যুদ্ধজাহাজের অস্তিত্ব নেই।
বাস্তবতা হলো, ট্রাম্পের নজর গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার দিকে নয়, বরং সেখানকার মাটির নিচে থাকা বিশাল খনিজ সম্পদের দিকে। ডেনমার্ক সরকার সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেও ট্রাম্প মিথ্যে প্রচার করছেন যে সেখানে চীনা বিনিয়োগের স্রোত বইছে।
গ্রিনল্যান্ডের মানুষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তারা বিক্রি হতে চায় না, বরং তারা স্বাধীনতা চায়। ট্রাম্পের কাছে গ্রিনল্যান্ড কেবলই একটি রিয়েল এস্টেট ডিল, যেখানে তিনি আমেরিকার ঝাণ্ডা পুঁতে সম্পদ লুণ্ঠন করতে চান।
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের ভূমিকা আরও বেশি রক্তক্ষয়ী এবং বিপজ্জনক। কোনো প্রমাণ ছাড়াই দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মাদক সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে শতাধিক মানুষকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই নিজেকে যুদ্ধে আছে ঘোষণা করে তিনি সাংবিধানিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন।
২০১৮ সালে মাদুরোকে হঠানোর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে এটি ট্রাম্পের কাছে একটি ব্যক্তিগত ইগো বা শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। তিনি এখন বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সাথে বৈঠক করছেন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফেরানো নয়। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁর আসল লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার তেল। দেশটি লুণ্ঠন করার এ প্রকাশ্য ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। শুধু ভেনেজুয়েলাই নয়, ট্রাম্পের এ তর্জন গর্জনের মুখে এখন মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াও হুমকির মুখে।
ইউক্রেন সংকটে ট্রাম্পের নীতি সবচেয়ে বেশি দ্বিচারী। তিনি প্রচার করেছিলেন যে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় তিনি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পকে সামান্য তোষামোদ করলেই ট্রাম্প পিছু হটেন।
পুতিন বোমা বর্ষণ অব্যাহত রাখেন, আর ট্রাম্প উল্টো দোষ চাপান ইউক্রেনের নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর। ইউক্রেনে ট্রাম্পের এ নীতিহীন অবস্থান দেশটিকে এক অন্তহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে না পারার এ অক্ষমতা কেবল ইউক্রেন নয়, বরং পুরো ইউরোপের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন, এ তিন সংকটে ট্রাম্পের তাণ্ডব একটি বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আর তা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্বলতা। ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা যে অসম্ভব, তা বারবার বুঝতে পারলেও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট সিদ্ধান্তটি এখন কেবল একটি রাজনৈতিক ভুল নয়, বরং ইউরোপের সংহতির ওপর একটি আত্মঘাতী আঘাত হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।
ইউরোপ আজ ট্রাম্পের মিথ্যার সামনে অসহায়। ট্রাম্পের মতো একজন প্রেসিডেন্ট, যার কাছে নৈতিকতা বা সততার কোনো মূল্য নেই, তাঁর ওপর নির্ভর করা যে কতটা বিপজ্জনক, তা এখন প্রতিটি সংকটে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, মিথ্যা তিন প্রকার, মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে সেই উক্তি বদলে দিয়ে বলা যায়, মিথ্যা তিন প্রকার, মিথ্যা, মারাত্মক মিথ্যা আর ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এ তিন ভূখণ্ডকে এক সুতায় বাঁধার মূল উদ্দেশ্য হলো, একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদর্শন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ দখল।
গ্রিনল্যান্ডের বরফ, ভেনেজুয়েলার তেল আর ইউক্রেনের ভূ রাজনীতি, সবই এখন ট্রাম্পের গ্রেট আমেরিকা গড়ার মিথ্যার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববাসী যদি এ সম্মিলিত মিথ্যার বিরুদ্ধে এখনই রুখে না দাঁড়ায়, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্থিতিশীলতা চিরতরে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন