মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘দাদা’ হিসেবে পরিচিত অজিত পাওয়ারের আকস্মিক মৃত্যুতে এনসিপি এখন এক অস্তিত্ব সংকটের মুখে। শারদ পাওয়ারের হাত ছেড়ে যখন তিনি নিজের দল সাজিয়েছিলেন, তখন তার প্রধান শক্তি ছিল ব্যক্তিগত আনুগত্য।
এখন সেই আনুগত্যের উত্তরাধিকার নিয়ে দলের অভ্যন্তরে তিনটি প্রধান শক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ক্ষমতার লড়াই শুরু হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে: পরিবার, অভিজ্ঞ সংগঠক এবং আঞ্চলিক প্রভাবশালী নেতা।
ভারতীয় রাজনীতিতে পরিবারের উত্তরাধিকার সবসময়ই একটি বড় ফ্যাক্টর। এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন অজিত পাওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা পাওয়ার।
শক্তি: ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হারলেও সুনেত্রা এখন রাজ্যসভার সদস্য এবং রাজ্যজুড়ে পরিচিত মুখ। বারামতি অঞ্চলে সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তার একটি নিজস্ব ভিত্তি রয়েছে। পাওয়ার পরিবারের নাম ভাঙিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে তিনি হতে পারেন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য 'ইমোশনাল কার্ড'।
সীমাবদ্ধতা: প্রশাসনিক ও আইনসভা পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। অজিত পাওয়ারের মতো কঠোর হাতে দল ও আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁর কতটা আছে, তা নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই সংশয় রয়েছে।

অন্যদিকে, বড় ছেলে পার্থ পাওয়ার ২০১৯ সালের নির্বাচনে হেরে গিয়ে রাজনীতিতে অনেকটা নেপথ্যে চলে গেছেন। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হলেও তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বর্তমানে তলানিতে। চাচাতো ভাই রোহিত পাওয়ারের উত্থান পার্থর জন্য পারিবারিক প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং শারদ পাওয়ারের একসময়ের ছায়াসঙ্গী প্রফুল প্যাটেল বর্তমানে দলটির সবচেয়ে বড় ‘ব্রেইন’ বা মগজ।
শক্তি: দিল্লির রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব এবং বিজেপি তথা মহাযুতি জোটের সাথে দরকষাকষির সক্ষমতা তাঁকে নেতৃত্বের দৌড়ে অনন্য করে তুলেছে। এনসিপির বিভাজনের সময় তিনিই ছিলেন অজিত পাওয়ারের প্রধান কুশলী। দলকে আইনি ও কৌশলগতভাবে টিকিয়ে রাখতে তাঁর কোনো বিকল্প নেই।
সীমাবদ্ধতা: প্যাটেল মূলত একজন ড্রয়িংরুম পলিটিশিয়ান। মহারাষ্ট্রের গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর কোনো বড় ভোটব্যাংক নেই। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সাথে তাঁর দূরত্ব নেতৃত্বের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মহারাষ্ট্র এনসিপির বর্তমান সভাপতি সুনীল তাতকারে এখন নেতৃত্বের অন্যতম দাবিদার।
শক্তি: রায়গড় ও কনকন অঞ্চলে তাঁর শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সমবায় ঘাঁটি রয়েছে। তিনি একজন দক্ষ সংগঠক এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পালস বোঝেন। পানিসম্পদ ও গ্রামীণ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সামলানোর ফলে তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও তুঙ্গে।
সীমাবদ্ধতা: তাঁর প্রভাব মূলত নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। অজিত পাওয়ারের মতো সমগ্র মহারাষ্ট্রের মারাঠা ভোটব্যাংককে এক সুতোয় গাঁথার মতো সর্বজনীন ইমেজ তাঁর এখনো তৈরি হয়নি।
দলের নেতৃত্বের প্রশ্নে ছগন ভুজবালের মতো প্রবীণ ওবিসি নেতার নাম আসলেও তাঁর বয়স এবং অতীত দুর্নীতির কলঙ্ক একটি বড় অন্তরায়। তবে তিনি দলের মুরুব্বি হিসেবে ঐক্য ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করবেন।
অন্যদিকে, ধনঞ্জয় মুণ্ডে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও তেজস্বী নেতা হলেও একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি তাঁর মন্ত্রিত্ব হারানো এবং ওবিসি পরিচিতি এনসিপির মতো মারাঠা-প্রধান দলে তাঁকে শীর্ষ পদে বসানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অজিত পাওয়ারের অবর্তমানে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ‘মহাযুতি’ জোট এখন এনসিপিকে কীভাবে ব্যবহার করবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার চাচা শারদ পাওয়ার কি এই সুযোগে অজিত শিবিরের বিধায়কদের পুনরায় নিজের দিকে টেনে নেবেন? যদি এনসিপির ভেতরে নেতৃত্বের কোন্দল চরমে পৌঁছায়, তবে দলটির একটি বড় অংশ পুনরায় শারদ পাওয়ারের ছায়াতলে ফিরে যেতে পারে।
অজিত পাওয়ারের শূন্যস্থান পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এনসিপি একটি ‘যৌথ নেতৃত্ব’ (Collective Leadership) মডেল বেছে নিতে পারে। যেখানে সুনেত্রা পাওয়ার হবেন দলের মুখ, প্রফুল প্যাটেল সামলাবেন দিল্লি ও জোটের সমীকরণ, আর সুনীল তাতকারে দেখবেন সাংগঠনিক দিক। কিন্তু এই তিন শক্তির মধ্যে ইগো বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হলে অজিত পাওয়ারের তিল তিল করে গড়া এই দলটির পতন ঠেকানো কঠিন হবে।
মহারাষ্ট্রের পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এনসিপি কি তার নতুন সূর্য খুঁজে পাবে, নাকি শারদ পাওয়ারের কাছেই আবার ফিরে যাবে—তার উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক নাটকীয়তায়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন