মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে আচ্ছন্ন। ইরানের চারপাশে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিশাল সামরিক সমাবেশ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি শাসন পরিবর্তনের হুমকি তেহরানকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় নিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সাবেক ইরানি কূটনীতিক সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ানের মতে, ইরান এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে যেখানে সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গ গোটা অঞ্চলকে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের সার্বভৌমত্ব বা শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর কোনো আঘাত এলে তারা সর্বোচ্চ শক্তিতে পাল্টা আক্রমণ চালাবে।
গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ইরানের ওপর এক নাটকীয় সামরিক অভিযান চালায়। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ সামরিক ও পারমাণবিক কর্মকর্তাদের হত্যা করা, যাতে নেতৃত্বহীন দেশটিতে সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ শুরু করে। ডজনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হলেও পরিকল্পনাকারীদের হিসাব মেলেনি।
সাধারণ মানুষ সরকারের পাশে দাঁড়ায় এবং ইরান পাল্টা শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরায়েলকে কাঁপিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ট্রাম্প ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দিলে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। তবে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলকে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করলেও সংঘাতের মূল কারণগুলো এখনো অমীমাংসিত।
২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ধস নামলে মুদ্রার দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে আসেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্ল্যান বি বাস্তবায়ন করতে চায়, যার লক্ষ্য হলো নিচ থেকে বিদ্রোহ এবং উপর থেকে সামরিক আঘাত।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির অভিযোগ, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে নাশকতা চালিয়ে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে যেন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত পায়। তবে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে লাখো মানুষের সরকার সমর্থিত সমাবেশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায় এ বিদেশি প্ররোচনা ব্যর্থ হয়।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরানোর হুমকি দিচ্ছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম একে নাৎসি শাসনের পতনের সাথে তুলনা করেছেন। এর জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, সর্বোচ্চ নেতার ওপর আঘাত মানে পুরো জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। পাশাপাশি ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রস্তাব দিয়েছে ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল টার্মিনাল দখল করার।
উল্লেখ্য, এখান দিয়েই ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। এ টার্মিনাল ধ্বংস বা দখল করা মানে ইরানের অর্থনীতিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া।
ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে সৌদি আরব, মিশর, ওমান ও কাতারের মতো আঞ্চলিক দেশগুলো। তারা আশঙ্কা করছে, এ যুদ্ধ শুরু হলে তা কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
অন্যদিকে ইরান তার পূর্বমুখী কৌশল জোরদার করে রাশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্ক আরও মজবুত করেছে। হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও জানিয়ে দিয়েছে যে ইরানে হামলা হলে তারা চুপ করে বসে থাকবে না।
সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ান সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্পের আত্মসমর্পণ না হলে যুদ্ধ কৌশল পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে ইরান যে ধৈর্য দেখাচ্ছে তা কেবল একটি রক্তাক্ত বিরতি। পরবর্তী হামলা হলে ইরান আর সংযম দেখাবে না। অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে ইরান এমন পাল্টা আঘাত হানবে যা গোটা অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি যেন একটি বারুদের স্তূপ, যার ওপর সবাই বসে আছে। বিপর্যয় এড়াতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রাসী কৌশল বাদ দিয়ে একটি সম্মানজনক ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে। অন্যথায় গত ৪৭ বছরের শত্রুতা এক মহাপ্রলয়ঙ্কারী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে, যার ফল কারোর জন্যই শুভ হবে না।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন