দেবভূমির মানবিক কণ্ঠস্বর: ‘মোহাম্মদ দীপক’ হয়ে এক মুসলিম বৃদ্ধকে বাঁচালেন হিন্দু যুবক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
দেবভূমির মানবিক কণ্ঠস্বর: ‘মোহাম্মদ দীপক’ হয়ে এক মুসলিম বৃদ্ধকে বাঁচালেন হিন্দু যুবক

ভারতের উত্তরাখণ্ডের শান্ত জনপদ কোটদ্বার এখন এক অভূতপূর্ব মানবিক সাহস এবং তার বিপরীতে জেগে ওঠা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সাক্ষী। উগ্র হিন্দুত্ববাদী উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাত থেকে সত্তরোর্ধ্ব এক মুসলিম দোকানিকে বাঁচাতে গিয়ে হিন্দু যুবক দীপক কুমার যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন কমা তা পুরো ভারতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তবে এই মানবিকতা দীপককে এনে দিয়েছে উগ্রপন্থীদের রোষানল আর পুলিশের করা মামলার খড়্গ।

গত ২৬ জানুয়ারি কমা ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে যখন দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ কমা তখন কোটদ্বার পৌর এলাকায় এক বৃদ্ধ মুসলিম দোকানিকে ঘিরে ধরে একদল উগ্রবাদী। বৃদ্ধের নাম উকিল আহমেদ কমা যিনি কম্পন রোগ বা পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। 

উগ্রবাদীদের অভিযোগ ছিল কমা উকিল আহমেদের দোকানের নামের সঙ্গে বাবা শব্দটি কেন যুক্ত আছে? তাদের দাবি ছিল কমা একজন মুসলিম তাঁর দোকানের নাম বাবা রাখতে পারেন না। তারা বৃদ্ধকে নাম মুছে ফেলতে চাপ দিচ্ছিল এবং হেনস্তা করছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে দৃশ্যপটে হাজির হন ৩৭ বছর বয়সী স্থানীয় যুবক দীপক কুমার। জনৈক ব্যায়ামাগারের প্রশিক্ষক বা জিম ট্রেইনার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার দীপক উগ্র জনতাকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় কমা দীপক মবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সগর্বে বলছেন কমা আমার নাম মোহাম্মদ দীপক।

প্রকৃতপক্ষে দীপক মুসলিম নন কমা কিন্তু সেই মুহূর্তে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি সংহতি জানাতে এবং উগ্রবাদীদের ধর্মীয় উন্মাদনাকে তুচ্ছজ্ঞান করতে তিনি নিজের নামের আগে মোহাম্মদ যুক্ত করেন। তাঁর এই একক প্রতিরোধে সেদিন বৃদ্ধ উকিল আহমেদ বড় ধরনের শারীরিক লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা পান।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপক কুমারের জয়জয়কার শুরু হয়। মানুষ তাঁকে প্রকৃত হিন্দু এবং মানবিকতার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই তাঁর জন্য বিপদ ডেকে আনে। 

শনিবার বজরং দলের একদল সদস্য দীপকের বাড়িতে এবং ব্যায়ামাগারে চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে পুলিশ দ্রুত সেখানে অবস্থান নেয় এবং উগ্রপন্থীদের আটকে দেয়। মঙ্গলবার দীপকের জন্মদিন থাকায় উগ্রবাদীরা পুনরায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে কমা এমন আশঙ্কায় তাঁর জিম ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এই ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনটি পৃথক প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এফআইআর দায়ের করেছে কমা যা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রথম মামলাটি হয়েছে হেনস্তার শিকার দোকানি উকিল আহমেদের অভিযোগে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় মামলাটি হয়েছে স্থানীয় এক ব্যক্তির অভিযোগে খোদ দীপক কুমার এবং তাঁর বন্ধু বিজয় রাওয়াতের বিরুদ্ধে। 

আর তৃতীয় মামলাটি করেছে পুলিশ বজরং দলের অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। মানবিক কাজে এগিয়ে এসেও কেন দীপকের বিরুদ্ধে মামলা হলো কমা তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

কোটদ্বারের এই ঘটনা উত্তরাখণ্ডের রাজনীতিতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। রাজ্য বিজেপি সভাপতি মহেন্দ্র ভাট দাবি করেছেন কমা এটি একটি সাজানো ঘটনা। তিনি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করে বলেন কমা রাহুল এই ইস্যু ব্যবহার করে দেবভূমির শান্ত পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছেন। বিজেপি একে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। 

অন্যদিকে, কমা রাজ্য কংগ্রেসের সহ সভাপতি সূর্যকান্ত ধাসমানা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন কমা কেন উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাত হিসেবে মামলা হলো আর দীপকের নাম সরাসরি মামলার নথিতে এলো? তিনি অভিযোগ করেন কমা বিজেপি সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ধর্মীয় মেরুকরণকে উসকে দিচ্ছে।

গত সোমবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে দীপক কুমার তাঁর অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানান। তিনি বলেন কমা আমি নিজেকে মোহাম্মদ দীপক বলেছিলাম কারণ ওই উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিরুদ্ধে এটাই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিবাদ। আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে দায়বদ্ধ। ধর্মের কারণে একজন অসুস্থ বৃদ্ধকে লাঞ্ছিত করা হচ্ছিল কমা তাঁর পাশে দাঁড়ানো আমার মানবিক দায়িত্ব ছিল। এই মামলা বা হুমকিতে আমি মোটেও বিচলিত নই। বর্তমানে শহরের প্রধান সড়ক ও বাজারগুলোতে পুলিশের নিরবচ্ছিন্ন টহল চলছে। সন্দেহভাজন যানবাহন ও ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে। 

প্রদীপ নেগি নামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শহরে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে যাতে উত্তেজনা আর না বাড়ে। দীপক কুমার প্রমাণ করেছেন যে কমা উগ্রবাদের মুখে একজন মানুষের সাহসই যথেষ্ট হতে পারে বড় কোনো অঘটন রুখে দিতে। তবে প্রশাসন যেভাবে প্রতিবাদী যুবকের বিরুদ্ধেই মামলার পথে হেঁটেছে কমা তা ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের পথে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

জেএইচআর