আমদানিতে রেকর্ড প্রতিশ্রুতি, ভারতের ট্রাম্প-কার্ড কি তবে মার্কিন পণ্য?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
আমদানিতে রেকর্ড প্রতিশ্রুতি, ভারতের ট্রাম্প-কার্ড কি তবে মার্কিন পণ্য?

বিশ্ব অর্থনীতির দুই প্রধান শক্তি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে। এই চুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর অন্তত ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নয়াদিল্লি।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট বা আমেরিকা প্রথম নীতির বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি তবে নিজের বিশাল বাজার উন্মুক্ত করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক অসম লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ল, নাকি এর আড়ালে রয়েছে মোদি সরকারের সুদূরপ্রসারী কোনো কূটনীতি?

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত যে পরিমাণ মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৫ অর্থবছরে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪৫.৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এই আমদানির তালিকায় থাকছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিপণ্য, উড়োজাহাজ, মূল্যবান ধাতু ও জ্বালানি তেল। এ ছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট পণ্য, কয়লা এবং নির্দিষ্ট কিছু কৃষিজাত পণ্যও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনবে ভারত।

গত বছর আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল, যা বাণিজ্য সম্পর্কে শীতলতা তৈরি করে। তবে সোমবারের ঘোষণায় দেখা গেছে, সেই শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে ওয়াশিংটন। একে ১৮ শতাংশের ম্যাজিক বা জাদু হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিনিময়ে ভারত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন এবং পাঁচ বছরে মোট ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার নিশ্চয়তা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর শুল্ক নীতি থেকে রক্ষা পেতেই মোদি সরকার এই বিশাল অঙ্কের আমদানির পথে হেঁটেছে। এটি মূলত একটি শুল্ক যুদ্ধের অবসান।

এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হলো কৃষি। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল দাবি করেছেন, বিশাল আমদানির প্রতিশ্রুতি দিলেও দেশের কৃষক ও পশুপালকদের স্বার্থে কোনো আপস করা হয়নি। জেনেটিক্যালি মডিফাইড বা কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত শস্য, সয়াবিন মিল, পোল্ট্রি এবং ভুট্টার ক্ষেত্রে ভারত এখনো কঠোর সুরক্ষা বজায় রেখেছে।

তুলা, ডাল, কাঠবাদাম এবং পেঁয়াজের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি আমদানি করা যাবে না। তবে আপেল বা মদের মতো কিছু বিলাসী পণ্যের বাজার উন্মুক্ত করা হয়েছে, যা আগে থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা নিউজিল্যান্ডের জন্য খোলা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিমন্ত্রী ব্রুক রলিন্স এই চুক্তিকে মার্কিন গ্রামীণ অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল বিজয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বাণিজ্যে ১৩০ কোটি ডলারের ঘাটতি ছিল। মার্কিন প্রশাসনের আশা, ভারতের বিশাল বাজারে তাদের উদ্বৃত্ত ভুট্টা ও সয়াবিন খালাস করতে পারলে সেই ঘাটতি পূরণ হবে।

ভারত সরকারের এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষক সংগঠনের প্রতিবাদ। ভারতীয় কৃষক আন্দোলনের সমন্বয় কমিটি সরকারকে সতর্ক করে বলেছে, ২০১৮ সালের পর থেকে চীন ও মেক্সিকোর সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশাল পরিমাণ কৃষিপণ্য জমে আছে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতকে তাদের সেই অতিরিক্ত পণ্য ফেলার বাজার বা ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২২ সালে মার্কিন সয়াবিন রপ্তানি ৩৪.৪ বিলিয়ন ডলার থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে ২৪.৫ বিলিয়নে নেমেছে। ভুট্টার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কৃষকদের আশঙ্কা, মার্কিন সস্তা পণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা পথে বসবেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বরাবরই বলে আসছেন, ব্যক্তিগতভাবে বড় মূল্য দিলেও তিনি কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেবেন না। স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও তিনি কৃষক ও মৎস্যজীবীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

এই চুক্তির মাধ্যমে একদিকে যেমন ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রপ্তানি শুল্ক কমানো গেছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ কৃষিবাজারে নির্দিষ্ট সুরক্ষা বলয় দিয়ে তিনি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন। ভারত তার তথ্যপ্রযুক্তি ও টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি বাঁচাতে গিয়ে আমদানিতে বড় ছাড় দিয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, আগামী পাঁচ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার এই বিশাল অর্থনৈতিক চাপ ভারত কীভাবে সামাল দেয়। এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত কার জয় নিশ্চিত করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

জেএইচআর