মধ্যপ্রাচ্যে আবারও রণতরি মোতায়েন করে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও রণতরি মোতায়েন করে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে আবারও রণদামামা বেজে উঠেছে। দীর্ঘদিনের বৈরী দুই পক্ষ—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—যখন ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনার টেবিলে বসার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা পুরো অঞ্চলে উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যদি একটি সম্মানজনক ও কার্যকর চুক্তিতে না পৌঁছায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘কঠোরতম’ পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। এই হুমকির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও শক্তিশালী রণতরি মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পেন্টাগন।

গত সপ্তাহে ওমানের মাস্কাটে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্তার এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর তেহরানের প্রভাব নিয়ে সেখানে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার ওপর জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের মেজাজ ভিন্ন।

সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১২-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, "আমরা হয় একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, না হলে আমাদের এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি।" ট্রাম্পের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তিনি কেবল আলোচনার খাতিরে আলোচনায় বিশ্বাসী নন; বরং ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করে নিজের শর্ত মানাতে চান।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী নৌ-বহর মোতায়েন থাকলেও সেটিকে যথেষ্ট মনে করছেন না ট্রাম্প। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আরও অন্তত একটি বা দুটি বিমানবাহী রণতরি এই অঞ্চলে যুক্ত হতে পারে।

বর্তমানে এশিয়ায় মোতায়েন থাকা এই দানবীয় যুদ্ধজাহাজটিকে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়ে আনা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে এটি রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বর্তমানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক এই রণতরিটিকেও জরুরি ভিত্তিতে পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি আনা হতে পারে।

এই রণতরিগুলো ইরানের উপকূলে পৌঁছাতে বড়জোর এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কেবল শক্তি প্রদর্শনই নয়, বরং যেকোনো আকস্মিক হামলার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি সেরে রাখছে।

কেবল সমুদ্রেই নয়, আকাশ প্রতিরক্ষায়ও যুক্তরাষ্ট্র নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু করেছে। কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল-উদেইদ সামরিক ঘাঁটির সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী ট্রাকগুলো পুনরায় লোড করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি।

উল্লেখ্য, গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। ওয়াশিংটন এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না।

ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক এবং ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য’ চুক্তির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তবে মূল সমস্যা দাঁড়িয়েছে আলোচনার পরিধি নিয়ে।

পরমাণু ইস্যুর পাশাপাশি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রধান হাতিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কোনো সমঝোতা হবে না। ইসরায়েলি হামলার পর ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আরও বাড়িয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ট্রাম্পকে কোনোভাবেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ব্যাপারে নমনীয় হতে দেবেন না। অন্যদিকে ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলি প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই রণতরি মোতায়েনের ঘোষণা মূলত একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে কোণঠাসা করতে সামরিক ভীতি প্রদর্শন করছেন। তবে এই কৌশলে ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল অঞ্চলে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় ডেকে আনবে।

শান্তি আলোচনার সুতো এখন ওমানের হাতে হলেও মূল চাবিকাঠি ট্রাম্পের মেজাজ আর ইরানের অনড় অবস্থানের মধ্যে আটকে আছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জটিল সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এএন