ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের চ্যালেঞ্জ, চাপের মুখেও পাশ হলো প্রস্তাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের চ্যালেঞ্জ, চাপের মুখেও পাশ হলো প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ এক নতুন মোড় নিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে এবার খোদ মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ অবস্থান নিয়েছে। 

দীর্ঘ বিতর্কের পর প্রতিনিধি পরিষদে কানাডার পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক বাতিলের পক্ষে একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে। এই ঘটনাকে ট্রাম্পের একচ্ছত্র বাণিজ্যিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি ২১৯-২১১ ভোটের ব্যবধানে পাশ হয়। ভোটের এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও প্রস্তাবটি আটকে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় চমক ছিল ছয়জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার অবস্থান। তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এবং খোদ প্রেসিডেন্টের হুমকি উপেক্ষা করে ডেমোক্র্যাটদের আনা এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন। এই ছয় সদস্যের সমর্থনই শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি পাশের পথ সুগম করে দেয়।

ভোটগ্রহণ চলাকালেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল এ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বার্তা দেন। তিনি রিপাবলিকান সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে লেখেন যে প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটে কোনো রিপাবলিকান যদি শুল্কের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে নির্বাচনের সময় তাঁকে এর গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে। শুল্ক আমাদের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং কোনো রিপাবলিকানেরই এ সুবিধা নষ্ট করার দায় নেওয়া উচিত নয়।

ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য হুমকি সত্ত্বেও ছয়জন রিপাবলিকান সদস্যের ভিন্নমত পোষণ করাকে মার্কিন রাজনীতিতে হোয়াইট হাউসের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর আমেরিকা প্রথম নীতিকে আরও কঠোর করেছেন। 

গত বছর তিনি প্রতিবেশী দেশ কানাডার ওপর দফায় দফায় শুল্ক আরোপ করেন। বিশেষ করে কানাডা যখন চীনের সাথে একটি নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার প্রস্তাব দেয়, তখন ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে কানাডীয় পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।

প্রস্তাবটির মূল উদ্যোক্তা ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস বলেন যে ট্রাম্প প্রশাসন মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ককে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত প্রতিবেশী কানাডার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকছে। ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এই প্রস্তাবটি অধিবেশনে তোলা বা এটি নিয়ে আলোচনা বন্ধ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন।

তবে রিপাবলিকান দলের ভেতরে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং ডেমোক্র্যাটদের অনড় অবস্থানের কারণে তিনি সফল হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটির আয়োজন করতে তিনি বাধ্য হন। প্রতিনিধি পরিষদে পাশ হলেও এই প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হওয়া এখন সুদূর পরাহত। 

এর কারণগুলো হলো উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের আধিপত্যের কারণে সেখানে এটি পাশ হওয়া বেশ কঠিন। এছাড়া যদি কোনোভাবে এটি পাশও হয়ে যায়, তবে আইন হওয়ার জন্য এতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যে নিজের নীতির বিরুদ্ধে আসা প্রস্তাবে স্বাক্ষর করবেন না তা তিনি আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি সরাসরি এতে বিশেষ ক্ষমতা বা ভেটো দিয়ে প্রস্তাবটি বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। 

তাই বর্তমানে এই পাশ হওয়া প্রস্তাবটিকে একটি প্রতীকী জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা মূলত প্রেসিডেন্টের নীতির বিরুদ্ধে একটি জোরালো রাজনৈতিক বার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

যদি এই শুল্ক নীতি বজায় থাকে তবে দুই দেশের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আদান-প্রদান আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিজ দলের ভেতরেও সবাই তাঁর চরমপন্থী বাণিজ্যিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন না। আগামী দিনে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হতে পারে।

জেএইচআর