ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি কোনো যুক্তির কাছেই পরাজয় স্বীকার করতে নারাজ। সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তাঁর প্রশাসনের কয়েকশ কোটি ডলারের আর্থিক সমঝোতা নিয়ে যে টানাপোড়েন চলছে, তাতে ট্রাম্পের চিরচেনা সেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি আবারও বিশ্ববাসীর নজরে এসেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, হার্ভার্ডের কাছে ২০০ কোটি ডলার দাবির অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত মিলতেই ট্রাম্প বিষয়টি অন্য মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।
তিনি মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা করেছেন, হার্ভার্ডের কাছে তাঁর দাবি এখন ১০০ কোটি ডলার এবং ভবিষ্যতে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি আর কোনো সম্পর্কই রাখতে চান না। এই আচরণের গভীরে লুকিয়ে আছে ট্রাম্পের এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ঢাল, কেউ আমাকে প্রত্যাখ্যান করার আগেই, আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করি।
হার্ভার্ডের কাছে এই বিশাল অঙ্কের দাবি কোনো সাধারণ অনুদান ছিল না। এটি ছিল রাজনৈতিক ও আইনি চাপের এক সংমিশ্রণ। ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ তুলেছিল, গাজা যুদ্ধ কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসগুলোতে ইহুদিবিদ্বেষ এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে হার্ভার্ড ব্যর্থ হয়েছে। ফেডারেল অর্থায়ন বন্ধের হুমকি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যখন দেখা গেল হার্ভার্ড তাঁর শর্তে নতি স্বীকার করছে না, তখনই তিনি নিজেকে প্রত্যাখ্যানকারী হিসেবে জাহির করতে শুরু করেন।
ট্রাম্পস টেন কমান্ডমেন্টস বইয়ে লেখকেরা দেখিয়েছেন, ট্রাম্পের রাজনীতির প্রধান একটি স্তম্ভ হলো পরাজয়কে আগেভাগে অস্বীকার করা। তাঁর দর্শনে হেড হলে আমি জিতব, টেল হলেও তুমি হারবে। তিনি কখনোই পরিস্থিতির শিকার হতে চান না, বরং সব সময় সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকতে চান। কেউ তাঁর সমালোচনা করলে বা সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলে, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দাবি করেন, সিদ্ধান্তটি তাঁরই ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ট্রাম্পের এই রিজেকশন গেম বা প্রত্যাখ্যানের খেলা নতুন কিছু নয়। গত এক দশকে এমন অসংখ্য উদাহরণ তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সালে এনবিএ চ্যাম্পিয়ন গোল্ডেন স্টেট ওয়ারিয়র্স যখন হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করার ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প দ্রুত ঘোষণা করেন, তিনিই তাদের আমন্ত্রণ বাতিল করেছেন। ওয়ারিয়র্সের কোচ স্টিভ কারের ভাষায়, তারা আমাদের ছেড়ে যাওয়ার আগেই তিনি আমাদের ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন।
শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত বক্তব্যের প্রতিবাদে যখন বড় বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা তাঁর উপদেষ্টা পরিষদ ছাড়তে শুরু করেন, ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে পুরো পরিষদই ভেঙে দেন এবং দাবি করেন এটি তাঁরই সিদ্ধান্ত। ২০২৫ সালের শুরুতে সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মিশেল কিং পদত্যাগ করলে ট্রাম্প দাবি করেন তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছিল ২০১৮ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের ক্ষেত্রেও। ম্যাটিস পদত্যাগ করলেও ট্রাম্প প্রচার করেন, তিনি নিজেই ম্যাটিসকে সরিয়ে দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের এই মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। ভোট হওয়ার কয়েক মাস আগেই তিনি ভিত্তি তৈরি করে রেখেছিলেন এই বলে, আমি কেবল তখনই হারতে পারি যদি নির্বাচনে কারচুপি হয়। অর্থাৎ পরাজয়কে তিনি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে ষড়যন্ত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। এই অস্বীকারের রাজনীতি তাঁকে তাঁর সমর্থকদের কাছে সর্বদা একজন অজেয় নেতা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প একধরনের কৃত্রিম জগত তৈরি করেছেন যেখানে তিনি কখনোই প্রত্যাখ্যাত নন। এই কৌশল তাঁকে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দেয়। হার্ভার্ডের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণাটি মূলত তাঁর অহংবোধ রক্ষার একটি হাতিয়ার মাত্র। বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের এই আগেভাগে প্রত্যাখ্যান করার রীতি আগামী দিনগুলোতে মার্কিন প্রশাসনের কূটনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন