ঋণ প্রতিশ্রুতিতে খরা: ভারত, চীন ও রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের নতুন সমীকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
ঋণ প্রতিশ্রুতিতে খরা: ভারত, চীন ও রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরের এক অভিনব চিত্র ফুটে উঠেছে বৈদেশিক ঋণ সহায়তার ক্ষেত্রে। দেশের প্রধান তিন উন্নয়ন সহযোগী ভারত, চীন ও রাশিয়া এই সময়ে কোনো নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি না দিলেও পুরোনো প্রকল্পের অর্থ ছাড় অব্যাহত রেখেছে। এটি যেমন এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়, তেমনি বর্তমান সরকারের সতর্ক অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। 

বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের মানচিত্রে এক বিশাল নীরবতা বিরাজ করছে। গত ১৮ মাসে অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো মেয়াদে ভারত, চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি মেলেনি। তবে বিস্ময়করভাবে এই তিন দেশ তাদের পূর্বঘোষিত ঋণের অর্থ ছাড় করা বন্ধ করেনি। সব মিলিয়ে এই সময়ে দেশ তিনটি থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু নতুন কোনো চুক্তির কলম চলেনি সচিবালয়ের ইআরডি (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) ভবনে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চিত্রটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণ। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সাথে এই দেশগুলোর সম্পর্কের যে রদবদল হয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটছে ঋণের এই পরিসংখ্যানে।

সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই পরিস্থিতিকে দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বিশেষ করে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সরাসরি ঋণ প্রতিশ্রুতিতে প্রভাব ফেলেছে।

ড. সেলিম রায়হানের মতে, ‘নতুন সরকার বড় প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। বিগত সরকারের নেওয়া কিছু বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও ব্যয়ের ন্যায্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ছিল। তাই বর্তমান সরকার রাশিয়ার রূপপুর প্রকল্প বা চীনের অর্থায়নের প্রকল্পগুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। এই সতর্ক অবস্থানই হয়তো দাতা দেশগুলোর দিক থেকে নতুন প্রতিশ্রুতির গতি ধীর করে দিয়েছে।’

২০১০ সাল থেকে ভারত তিনটি এলওসি-র (লাইন অব ক্রেডিট) মাধ্যমে প্রায় ৭৩৬ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু গত দেড় বছরে নতুন কোনো এলওসি নিয়ে আলোচনা পর্যন্ত শুরু হয়নি। ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে এই সময়ে মাত্র ২৯ কোটি ডলারের অর্থ ছাড় হয়েছে। বর্তমানে ভারতের অর্থায়নে নেওয়া ৩৬টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি শেষ হয়েছে এবং ৮টি চলমান। বাকি প্রকল্পগুলোর ভাগ্য এখন নতুন সরকারের পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করছে।

চীনের ঋণের ক্ষেত্রে বড় সমালোচনা ছিল এর ব্যয় এবং নির্মাণ মান নিয়ে। বর্তমান সরকারের আমলে চীনের এক্সিম ব্যাংক প্রায় সাড়ে ৬৩ কোটি ডলার ছাড় করেছে, যা মূলত পুরোনো অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থ। অন্যদিকে রাশিয়ার পুরো ঋণের উৎস হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই প্রকল্পে রাশিয়া ১১.৯৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিলেও গত দেড় বছরে নতুন কোনো প্রকল্পের নাম শোনা যায়নি। রূপপুর প্রকল্পের জন্য এই সময়ে ১২৫ কোটি ডলার ছাড় করেছে রাশিয়া।

ভারত, চীন বা রাশিয়া যখন ‘দেখো এবং অপেক্ষা করো’ নীতিতে চলছে, তখন উল্টো পথে হাঁটছে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাপানের মতো উন্নয়ন সহযোগীরা কিন্তু তাদের প্রতিশ্রুতির হাত গুটিয়ে নেয়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ১৯৯ কোটি ডলারের নতুন প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এটি প্রমাণ করে যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের তুলনায় বহুপাক্ষিক ও বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সাথে বর্তমান সরকারের বোঝাপড়া তুলনামূলক সহজ ছিল।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেভাবে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়ার ধুম পড়ে, অন্তর্বর্তী সরকার সেই পথে হাঁটেনি। বড় প্রকল্প মানেই দীর্ঘমেয়াদী ঋণের বোঝা এই উপলব্ধি থেকেই সরকার নতুন কোনো মেগা প্রজেক্টের দিকে পা বাড়ায়নি।

আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত বা চীনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা পুনরায় নতুন গতি পাবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের এই দেড় বছরের ‘সতর্ক ঋণ নীতি’ হয়তো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য ঋণের বোঝা কমানোর একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

এএন