যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক রণকৌশল এক অভাবনীয় আইনি প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং আইনি এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করার দায়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট।
শুক্রবার দেওয়া এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পের শুরু করা শুল্ক চাপের নীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেল।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে এটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলেই জাতীয় জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে যেকোনো দেশের ওপর খেয়ালখুশিমতো শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জনই ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ও এখতিয়ার বহির্ভূত বলে রায় দিয়েছেন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে রিপাবলিকান বা রক্ষণশীল সমর্থিত বিচারপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও, তিনজন রক্ষণশীল বিচারপতি উদারপন্থী বিচারপতিদের সঙ্গে একমত হয়ে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত পদক্ষেপের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। বাকি তিন বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ, ক্ল্যারেন্স থমাস এবং স্যামুয়েল আলিটো ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের ক্ষমতাকে সমর্থন করে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন বা আইইইপিএ ব্যবহার করেছিল। ট্রাম্পের দাবি ছিল, এই আইন তাঁকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা দেয়। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আইইইপিএ আইনটি প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক আরোপ বা পরিবর্তনের কোনো সরাসরি ক্ষমতা প্রদান করে না।
আদালত উল্লেখ করেন, এটি কেবল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্পদ অবরুদ্ধ বা লেনদেন নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়। শুল্ক আরোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের এই আইনের ব্যবহার আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। গত বছরের ২ এপ্রিল ট্রাম্প যখন এই পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন তিনি সেই দিনটিকে আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই অবৈধ ঘোষিত শুল্ক কাঠামোর আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আদায় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সুপ্রিম কোর্ট এই বিশাল অংকের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না, কিংবা এই অর্থের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দেননি। এটি নিয়ে এখন আইনি মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রগরি ডাকো এই রায়কে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য একটি বিরাট বিজয় হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গড় আমদানি শুল্কের হার ১৬.৮ শতাংশ থেকে দ্রুত ৯.৫ শতাংশে নেমে আসবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আরোপের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা বা সেকশন ৩০১ এর মতো অন্য কোনো আইনি পথ খোঁজার চেষ্টা করতে পারে।
ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের এরিকা ইয়র্ক মনে করেন, এই রায়ের ফলে হোয়াইট হাউসের খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কমবে। তিনি বলেন, আদালত আজ এটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র একটি আইনের শাসনে চালিত দেশ, যেখানে প্রেসিডেন্টের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও সংবিধান এবং আইনি সীমার অধীন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর বসানো শুল্কে সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আজকের এই রায়ের পর বিশ্ব শেয়ারবাজারে রপ্তানিমুখী এশীয় ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করেছে। মেক্সিকো ও কানাডার মতো বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলো এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে।
প্রেসিডেন্টের আইনি উপদেষ্টারা এখন নতুন কোনো কৌশল খুঁজছেন যাতে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে পুনরায় শুল্ক আরোপ করা যায়। তবে আপাতত এই রায় বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের এই চপেটাঘাত ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতিকে পুরোপুরি থামিয়ে না দিলেও বেশ খানিকটা শ্লথ করে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন