আদালতের রায়ে মুক্তি, ঘরে ফিরতেই স্ত্রী-সন্তানদের আলিঙ্গন ও চোখের জল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
আদালতের রায়ে মুক্তি, ঘরে ফিরতেই স্ত্রী-সন্তানদের আলিঙ্গন ও চোখের জল

নয়াদিল্লির আবহাওয়া আজ যেন কিছুটা অন্যরকম। আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাসভবনের সামনে আজ কোনো স্লোগান বা রাজনৈতিক সভার উত্তাপ ছিল না, ছিল এক প্রশান্তির ছায়া। দীর্ঘ তদন্ত এবং আইনি লড়াইয়ের পর দিল্লির বিশেষ আদালত যখন রায় দিল যে, কেজরিওয়াল ও মণীশ সিসোদিয়াসহ অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলার কোনো ভিত্তি নেই, তখন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং আপ সুপ্রিমোর চোখে পানি আটকে রাখা সম্ভব হয়নি।

রয়টার্স এবং এনডিটিভির ভিডিওতে দেখা গেছে, আদালতের এই স্বস্তিদায়ক রায়ের পর কেজরিওয়াল যখন তাঁর বাসভবনে পৌঁছান, তখন সেখানে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। কোনো রাজনৈতিক নেতার কঠোর প্রতিচ্ছবি নয়, বরং একজন সাধারণ বাবা এবং স্বামী হিসেবে ধরা দিলেন তিনি।

দিল্লির বিশেষ আদালত শুক্রবার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, দীর্ঘ তদন্তের পর প্রসিকিউশন এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি যার ভিত্তিতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা মণীশ সিসোদিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা যায়। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি এবং অভিযোগগুলো যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে, আদালতের এই পর্যবেক্ষণ তারই ইঙ্গিত দেয়।

আদালতের এই রায়ের পর আদালত কক্ষেই এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী মণীশ সিসোদিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা যায়। এটি ছিল কয়েক বছরের পুঞ্জীভূত চাপা কষ্টের বহিঃপ্রকাশ।

আদালত থেকে বাড়ি ফেরার পর কেজরিওয়ালকে এক অভাবনীয় অভ্যর্থনা জানান তাঁর স্ত্রী সুনীতা কেজরিওয়াল। ভিডিওতে দেখা যায়, দরজায় পা রাখতেই স্ত্রী সুনীতা তাঁকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন। কেবল স্ত্রী নন, তাঁর সন্তানরাও বাবাকে ঘিরে ধরেন।

রাজনীতির ময়দানে যাকে সবসময় কঠোর ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়, আজ পরিবারের মাঝে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নীরব ও আবেগপ্রবণ। স্বামীর এই দীর্ঘ লড়াইয়ে পর্দার আড়াল থেকে যিনি সবসময় শক্তি জুগিয়েছেন, সেই সুনীতা কেজরিওয়াল আজ তৃপ্তির হাসি হাসছিলেন এবং তাঁর চোখে ছিল আনন্দাশ্রু।

কেবল কেজরিওয়াল নন, এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এবং আপ নেতা মণীশ সিসোদিয়াও আজ দায়মুক্ত। বাসভবনে কেজরিওয়ালের সাথে উপস্থিত হয়ে তিনিও এই আনন্দ ভাগ করে নেন। সিসোদিয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সত্যের জয় হয়েছে। আমাদের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য বিপ্লবকে থামানোর যে চেষ্টা করা হয়েছিল, আজ তা ব্যর্থ হলো বলে তিনি উল্লেখ করেন।

২০২৬ সালের এই রায় আম আদমি পার্টির জন্য এক বিশাল সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করবে। গত কয়েক বছর ধরে দুর্নীতির অভিযোগে যেভাবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে কোণঠাসা করা হয়েছিল, এই নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর তারা দ্বিগুণ উৎসাহে রাজনীতিতে ফিরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় আদালতের এই সিদ্ধান্ত নৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এটি নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা পুনরুত্থানে ভূমিকা রাখবে। মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ায় ২০২৬-২৭ সালের নির্বাচনের পালে হাওয়া লাগবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এই মামলার তদন্ত চলাকালীন কেজরিওয়ালকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ছিল। বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুটিকে বড় করে তুলে ধরলেও, আজকের আদালতের রায়ে আম আদমি পার্টি তাদের সততার রাজনীতির তকমাটি পুনরায় ফিরে পেল।

দিল্লির রাস্তায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তবে আপ সমর্থকদের মধ্যে খুশির সীমা নেই। তারা মিষ্টি বিলি করে এবং স্লোগান দিয়ে এই দিনটিকে উদযাপন করছেন। তাঁদের মতে, এটি কেবল একজনের মুক্তি নয়, এটি দিল্লির মানুষের আস্থার জয়।

একজন সাধারণ সমর্থক বলেন, আমি সবসময় জানতাম তিনি নির্দোষ। আজ আদালত যা বলল, আমরা তা অনেক আগে থেকেই জানতাম এবং সত্যকে দমিয়ে রাখা যায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন। রাজনৈতিক সংবাদের ভিড়ে আজকের এই ছবিগুলো, যেখানে কেজরিওয়াল তাঁর পরিবারের সাথে আলিঙ্গন করছেন, তা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে পর্দার ওপারের মানুষগুলোও রক্ত-মাংসের মানুষ। তাঁদেরও পরিবার আছে এবং আবেগ আছে।

আজকের এই জয় কেবল আইনি দস্তাবেজের জয় নয়, এটি একটি পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সৃষ্টি কাপুরের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই সংবাদটি বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন মোড় নিয়ে আসবে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

জেএইচআর