দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক চরম নাটকীয় মোড় নিয়েছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত সংঘাত। শনিবার বিকেলে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদে পাকিস্তানের একটি এফ-১৬ (F-16) যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।
আফগান সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারী এই বিমানটিকে ভূপাতিত করেছে এবং এর পাইলটকে জীবিত অবস্থায় নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে।
শনিবার দুপুর থেকে জালালাবাদের আকাশে যুদ্ধবিমানের তীব্র গর্জন শোনা যাচ্ছিল। বার্তা সংস্থা এএফপি-র প্রতিনিধি জানান, বিকট শব্দের কিছুক্ষণ পরই শহরের বিমানবন্দরের দিক থেকে দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাইলটকে প্যারাসুট নিয়ে নিচে নামতে দেখা যায়। অবতরণের পরপরই স্থানীয় পুলিশ ও আফগান সামরিক সদস্যরা তাকে ঘিরে ফেলে এবং আটক করে।
পূর্ব আফগানিস্তানের সামরিক মুখপাত্র ওয়াহিদুল্লাহ মোহাম্মদী এই সফল অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আফগান বাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে। পাইলট বর্তমানে আমাদের হেফাজতে এবং নিরাপদ স্থানে রয়েছেন।
একই সুর শোনা গেছে পুলিশের মুখপাত্র তায়েব হাম্মাদের কণ্ঠেও। তিনি জানান, জালালাবাদ শহরে পাকিস্তানি আকাশসীমা লঙ্ঘনের ফলশ্রুতিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি আফগান বাহিনীর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার এক বড় বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তান সীমান্তে আফগান বাহিনী একটি বড় আকারের অভিযান চালায়। এর প্রতিশোধ হিসেবে শুক্রবার রাতে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহারে বিমান হামলা চালায়।
শনিবারের জালালাবাদ মিশনটি সম্ভবত পাকিস্তানের সেই ধারাবাহিক হামলারই অংশ ছিল। কিন্তু আফগান বাহিনীর ত্বরিত প্রতিক্রিয়া এবং যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনা পাকিস্তানের জন্য এক বড় সামরিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই স্পর্শকাতর ঘটনার বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী (ISPR) বা তথ্য মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেই ইসলামাবাদ প্রতিবেশী দেশের সাথে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ বিমান ভূপাতিত হওয়ার খবরটি সামরিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আফগান বাহিনীর কাছে এমন কোনো প্রযুক্তি আছে কি না যা দিয়ে এই অত্যাধুনিক বিমান ধ্বংস করা সম্ভব, তা নিয়ে জল্পনা চলছে।
আফগানিস্তানে পাকিস্তানি পাইলট আটকের ঘটনাটি দুই দেশের সম্পর্ককে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় পাইলটের মুক্তি নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক লড়াইয়ের পথ প্রশস্ত করে।
তোর্খাম ও স্পিন বোলডাক সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে উভয় দেশই অতিরিক্ত সৈন্য ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করেছে। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসরত সাধারণ মানুষ এখন যুদ্ধের ভয়ে ঘরবাড়ি ছাড়তে শুরু করেছেন।
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ডুরান্ড লাইন নিয়ে পাকিস্তানের সাথে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এবারের আকাশ যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই বিরোধ কেবল সীমান্ত সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাকিস্তান যদি তাদের পাইলট উদ্ধারে বড় কোনো অভিযান চালায়, তবে তা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন