মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ আর অনিশ্চয়তা, তখন বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ড অর্থাৎ জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ে এক নাটকীয় মোড় নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার ফ্লোরিডার মায়ামিতে নিজের গলফ ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের আবহে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু তেল উৎপাদনকারী দেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে তার প্রশাসন।
গত ২৪ ঘণ্টায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের যে অস্থিরতা দেখা গেছে, তা আধুনিক ইতিহাসে বিরল। এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২০ ডলারে উঠে গেলেও ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর তা দ্রুত নামতে শুরু করে এবং ৯০ ডলারের নিচে চলে আসে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন, "আমরা কিছু দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছি। বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেই নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নিতে যাচ্ছি। ‘তিনি আরও যোগ করেন, ‘কে জানে, হয়তো পরিস্থিতি ঠিক হয়ে গেলে আমাদের আর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিতেই হবে না পৃথিবীতে তখন হয়তো অনেক বেশি শান্তি বিরাজ করবে।’
যদিও ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এখন রাশিয়া এবং ভেনিজুয়েলার দিকে। বর্তমানে এই দুটি দেশের তেল খাতের ওপর ওয়াশিংটনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন মূলত রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। ইতিমধেই মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ভারতকে রুশ তেল বিক্রির ক্ষেত্রে ৩০ দিনের একটি বিশেষ ছাড় ঘোষণা করেছেন, যা বৈশ্বিক সরবরাহের ওপর চাপ কমানোর একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান অভিমুখে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর থেকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নাভিশ্বাস উঠেছে। যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম প্রাক-যুদ্ধ সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে থাকা।
ইরানি হুমকির মুখে এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া কাতার, সৌদি আরব এবং কুয়েতের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে ড্রোন হামলার (যার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে) ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়েছে।
বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার (Kpler)-এর অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহি আল জাজিরাকে বলেন, ‘যদি এপ্রিল মাস পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকে, তবে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়।‘ ট্রাম্পের বর্তমান পদক্ষেপ মূলত এই চরম মূল্যস্ফীতি রোধ করার একটি মরিয়া চেষ্টা।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি আমেরিকার ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শেষ করবেন। কিন্তু ইরানের সাথে চলমান সংঘাতের সময়সীমা নিয়ে সোমবার তিনি কিছু বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন।
একদিকে তিনি সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরান যুদ্ধ ‘প্রায় সম্পূর্ণ’ এবং সামরিক অভিযান ‘নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই’ এগোচ্ছে। অন্যদিকে, মায়ামির সংবাদ সম্মেলনে তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যতক্ষণ না শত্রু পুরোপুরি এবং চূড়ান্তভাবে পরাজিত হচ্ছে, ততক্ষণ আক্রমণ থামবে না। ‘রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণেও তিনি বলেন, "আমরা অনেক দিক থেকে জিতে গেছি, কিন্তু এখনো যথেষ্ট জয় আসেনি।’
ট্রাম্পের এই ‘নিষেধাজ্ঞা শিথিল’ করার নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দিলেও ভূ-রাজনৈতিকভাবে এটি একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। তবে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য এখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম কমানো এবং ভোটারদের তুষ্ট রাখা।
মঙ্গলবার জিএমটি ০২:০০ টার হিসাব অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮৪ ডলারে নেমে এসেছে। বাজার এখন পর্যবেক্ষণ করছে ট্রাম্পের এই ‘শান্তি ও তেল‘ সমীকরণ কতটা কার্যকর হয়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন