পারস্য উপসাগরের উত্তাল জলরাশি আর মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে এখন লাশের গন্ধ আর বারুদের ধোঁয়া। একদিকে আধুনিক মারণাস্ত্রের ঝনঝানি, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল, সব মিলিয়ে বিশ্ব এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল জোটের মধ্যকার এই সংঘাত এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মোড় পরিবর্তনকারী এক মহাযুদ্ধ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি রহস্যময় মন্তব্য বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, ইরানের সাথে এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ কবে শেষ হবে? ট্রাম্পের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যখন আমি এটি আমার ভেতর থেকে অনুভব করব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা সামরিক লক্ষ্যমাত্রার ইঙ্গিত নেই। বরং এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বহিঃপ্রকাশ। এই মন্তব্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম কেবল নিউজ নেটওয়ার্কসহ বিশ্বজুড়ে বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
সমালোচকদের মতে, একটি দেশের নিরাপত্তা বা যুদ্ধ বিরতির সিদ্ধান্ত যদি কেবল একজনের অনুভবের ওপর নির্ভর করে, তবে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানকে সরাসরি সমর্থন দিয়ে আসা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস আজ এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দিয়েছে। ইরানকে আত্মরক্ষার অধিকার দিলেও, তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু না করার জন্য তেহরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
হামাস বলেছে, যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে, তবে ভাইদের প্রতি আমাদের অনুরোধ, প্রতিবেশী দেশগুলো যেন এই রোষানল থেকে রক্ষা পায়। হামাসের এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, তারা চায় না এই যুদ্ধ পুরো মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী ফাটল তৈরি করুক।
বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো যখন তাদের সীমান্ত ও তেলের স্থাপনা নিয়ে আতঙ্কিত, তখন হামাসের এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন সামরিক শক্তির পূর্ণ প্রদর্শন হিসেবে ইতিমধ্যে ২,৫০০ জন দক্ষ মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। জাপানের ওকিনাওয়া থেকে আসা এই দলটির সাথে রয়েছে উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি।
এটি মূলত ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে সরাসরি স্থল অভিযান বা সংকটকালীন উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য মোায়েত করা হচ্ছে। সামরিক কৌশলের ভাষায় এটি একটি হাই অ্যালার্ট মোতায়েন, যা প্রমাণ করে যে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে নয়, বরং আরও বাড়াতে প্রস্তুত।
ইরানের অর্থনীতির জীবনীশক্তি বলা হয় খারগ দ্বীপকে। আজ ভোরে সেখানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছেন, তবে তেলের অবকাঠামোতে হামলার হুমকি এখনও টেবিলে রয়ে গেছে। খারগ দ্বীপের এই হামলা তেলের বাজারে যে আগুনের উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তার প্রভাবে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। চীনসহ এশিয়ার অনেক দেশ যারা ইরানের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু কেবল ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। আজ ইরাকের বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির তথ্যমতে, দূতাবাসের ভেতরে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে এবং একটি হেলিকপ্টার অবতরণ স্থলেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
অন্যদিকে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় চিকিৎসাকর্মী ও শিশুসহ বহু প্রাণহানি ঘটেছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে ইসরায়েলের হাইফা ও তেল আবিব লক্ষ্য করে পাল্টা রকেট হামলা চালানো হচ্ছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিকে ধরিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপে ইরান ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা তাদের নেতার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দর এবং আবাসিক এলাকাগুলোতে নিয়মিত বিস্ফোরণের শব্দ যুদ্ধের বিভীষিকাকে সাধারণ মানুষের ঘরের দরজায় পৌঁছে দিয়েছে।
সাবেক মার্কিন দূতরা দাবি করছেন যে ট্রাম্প হয়তো দুই সপ্তাহের মধ্যে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেন, কিন্তু ট্রাম্পের নিজের বক্তব্য সেই আশাকে ক্ষীণ করে দিয়েছে। রাশিয়ার সমর্থন এবং ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা এই যুদ্ধকে একটি মৃতপ্রায় দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই অনুভবের দিকে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের যে ক্ষত তৈরি হচ্ছে, তা কেবল কোনো এক ব্যক্তির অনুভূতি দিয়ে সেরে ওঠা সম্ভব নয়। কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস আর আধুনিক জ্বালানি সাম্রাজ্যের এই সংঘাত মানবসভ্যতাকে এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পরাজয় হবে সাধারণ মানুষের আর লাভ হবে কেবল সমরাস্ত্র ব্যবসায়ীদের।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন