মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন শুধু বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধের দামামা। গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইরান। গত ২৪ ঘণ্টার নাটকীয় ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তেহরানের শাসনকাঠামো হয়তো তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম কাণ্ডারি আলী লারিজানি এবং বাসিজ ফোর্সের প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানি নিহত হয়েছেন। এই দ্বৈত আঘাত এবং সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা তেহরানকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক বিবৃতিতে দাবি করেন, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান আলী লারিজানি নিহত হয়েছেন। লারিজানি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন ইরানের বাস্তববাদী রাজনীতির মুখ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে পরমাণু আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী।
বিশ্লেষণ: লারিজানিকে হত্যা করার অর্থ হলো ইরানের কৌশলগত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানা। গত ১ মার্চ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর লারিজানিই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি রাষ্ট্রকে সংহতি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তার মৃত্যু যদি সত্য হয়, তবে ইরানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে।
অন্যদিকে, আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ ফোর্সের’ কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী (IDF)। বাসিজ বাহিনী হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মূল শক্তি।
যেকোনো গণঅভ্যুত্থান বা বিদ্রোহ দমনে এই বাহিনীই ছিল মূল ভরসা। সোলাইমানির মৃত্যু বাসিজ ফোর্সের ‘কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল’ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অকেজো করে দিতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার পুত্র এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে হত্যার একটি বড় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, তিনি অল্পের জন্য ‘বেঁচে গেছেন’। এই হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন তেহরানে ইসরায়েলি বিমান হামলা তীব্রতর হয়েছে। মোজতবা খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার অর্থ হলো ইরানের পরবর্তী নেতৃত্বকে অঙ্কুরেই বিনাশ করার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা।
এই যুদ্ধ আর কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জ্বালানি ট্যাংকে ড্রোনের আঘাত হেনেছে, যার ফলে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত রাখা হয়। ওমান উপকূলে তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস এবং বিমানবন্দরে মুহুর্মুহু ড্রোন ও রকেট হামলা চলছে। কাতারের শিল্প এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। লোহিত সাগরে অবস্থানরত মার্কিন রণতরি ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’-এ টানা ৩০ ঘণ্টা আগুন জ্বলেছে। ইরান দাবি করেছে, তাদের শব্দের চেয়ে ১৩ গুণ দ্রুতগামী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এই যুদ্ধে ঘি ঢেলেছে। তিনি দাবি করেছেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সামর্থ্য ৯০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যের এই বিস্তৃত যুদ্ধে সরাসরি জড়াবে না। জার্মানিও ট্রাম্পের ডাকে সাড়া দেয়নি। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর সাহায্য করেছে, তারা এখন এই সংকটকালে পাশে দাঁড়াচ্ছে না। তিনি এমনকি ন্যাটোকেও সতর্ক করেছেন।
বাইরে যখন ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি, ভেতরে তখন ‘গুপ্তচর’ আতঙ্কে অস্থির ইরান। শত্রুদের তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ইরান জুড়ে অন্তত ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তেহরান দাবি করেছে তারা ১০ জন বিদেশি গুপ্তচরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাদচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শিক্ষা পেয়েছে, আমরা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
গত কয়েকদিনের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৩৩৯ ইসরায়েলি আহত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সংখ্যা ১৪২ জন। ইরান যুদ্ধে ১৩ মার্কিন সেনা নিহত এবং অন্তত ২০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরানে এখনো হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তু রয়েছে এবং তাদের অন্তত তিন সপ্তাহের সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত আছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ট্রাম্প ও স্টারমারের মধ্যে এই প্রণালি খোলা রাখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক তেলের বাজারকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়া ইরানকে ড্রোন সরবরাহ করছে বলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যে দাবি করেছেন, তা যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক মাত্রাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মার্চ ১৬ এবং ১৭ তারিখের এই ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান তার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষ নেতাদের হারানো, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ভয় এবং চতুর্মুখী আকাশপথের হামলা ইরানকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া।
যদি আলী লারিজানি এবং গোলামরেজা সোলাইমানির মৃত্যুর খবর তেহরান নিশ্চিত করে, তবে সেটি হবে বর্তমান শাসনের পতনের প্রথম ঘণ্টা। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, তারা যদি পাল্টা মরণকামড় দেয়, তবে এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি পুরো পৃথিবীকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন