শান্তির সন্ধানে বিশ্ব 

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ‘বিজয়’ কার, আর কারই বা প্রাপ্তি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ‘বিজয়’ কার, আর কারই বা প্রাপ্তি?
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবরে রাজপথে নেমে উল্লাস করেন ইরানের রাজধানী তেহরানের বাসিন্দারা। ছবি: রয়টার্স

ভয়াবহ এক মহাপ্রলয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এল বিশ্ব। গত কয়েকদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে বারুদের গন্ধ আর পারমাণবিক যুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, তা আপাতত থিতু হয়েছে দুই সপ্তাহের এক সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণায়। তবে এই যুদ্ধবিরতিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। 

একদিকে ইরান দাবি করছে তাদের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত জয়’। যখন দুই পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে উৎসবে মেতেছে, তখন বিশ্ববাসীর মনে একটাই প্রশ্ন আসলে জয়ী কে? নাকি এই জয়ে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো ধ্বংসের বীজ?

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অত্যন্ত জোরালো ভাষায় এই যুদ্ধবিরতিকে তাদের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তেহরানের রাজপথে সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাস আর মিছিলে এটিই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তারা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের মুখে নতি স্বীকার করেনি। 

ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগেই তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ দফার একটি কঠোর প্রস্তাব মানতে বাধ্য করেছে।

এই ১০ দফার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কোনো আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা, বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনীখ্যাত ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। 

ইরান মনে করছে, ট্রাম্পের মতো একজন কঠোর মেজাজের প্রেসিডেন্টকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারা এবং তাদের শর্তগুলো প্রাথমিক স্বীকৃতি পাওয়া একটি বিশাল কূটনৈতিক ও সামরিক সাফল্য। ইরানি নেতাদের মতে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি এবং প্রতিরোধের দেয়াল ট্রাম্পের ‘এক রাতেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকিকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।

ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন ভিন্ন কথা। এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছে। ট্রাম্পের যুক্তিতে এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তিনি ইরানকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে নিয়ে আসতে পেরেছেন। বিশেষ করে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ‘ঠিকঠাক দেখভাল’ করার যে শর্তের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তাকে ওয়াশিংটন তাদের গোয়েন্দা ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন দেখাতে চাচ্ছে যে, তাদের প্রচণ্ড সামরিক চাপের কারণেই ইরান শেষ মুহূর্তে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, এই যুদ্ধবিরতি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণের একটি মোক্ষম সুযোগ। 

তবে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হলে তিনি কি আবার ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংসের হুমকিতে ফিরে যাবেন তখন তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, ‘সময়ই বলে দেবে।‘এই রহস্যময় উত্তর ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্পের ‘বিজয়’ আসলে একটি সাময়িক কৌশলও হতে পারে।

এই যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি প্রক্রিয়ার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এখানেই নির্ধারিত হবে ১০ দফার প্রস্তাবগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং দেশটির সামরিক নেতৃত্ব এই আলোচনা সফল করতে দিনরাত কাজ করছেন। 

সৌদি আরব, তুরস্ক এবং চীনের মতো দেশগুলোও এই প্রক্রিয়ায় সমর্থন জোগাচ্ছে। তবে ইরান পরিষ্কার করে দিয়েছে, ‘যুদ্ধবিরতির অর্থ এই নয় যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। তাদের হাতের আঙুল এখনো ‘ট্রিগারে’ রয়েছে বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

বিজয় কার এই বিতর্কের আড়ালে পড়ে গেছে যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। গত কয়েক দিনের হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা ১,৫০০ ছাড়িয়েছে, আহত হয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় দক্ষিণ লেবানন আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। অন্যদিকে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে রেলওয়ে সেতু, যোগাযোগ পথ এবং খারগ দ্বীপের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতেও ধস নেমেছিল। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১১ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতির খবর আসার সাথে সাথে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ১০ শতাংশের বড় পতন ঘটেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আপাতত স্বস্তির খবর। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দায় কে নেবে? হিজবুল্লাহর মুহুর্মুহু রকেট হামলা আর ইসরায়েলের অত্যাধুনিক বিমান হামলার মাঝে পিষ্ট হয়েছে সাধারণ বেসামরিক মানুষ।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সায় দিলেও একটি বড় ‘শর্ত’ জুড়ে দিয়েছেন। তিনি ইরানের ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি মানলেও লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথে একটি বড় অন্তরায়। কারণ ইরান ও হিজবুল্লাহর ভাগ্য একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে ইরানের পক্ষে কতক্ষণ শান্ত থাকা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘শুভ বুদ্ধির উদয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গের মতো অনেকেই বিশ্বনেতাদের নীরবতা এবং যুদ্ধের পরিবেশ তৈরির সমালোচনা করেছেন। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের এই চরমপন্থা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, এমনকি এনএএসিপি-র মতো সংগঠনগুলো তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ডাক দিয়েছে।

ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই যখন নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতকে তুষ্ট করতে ‘বিজয়’ দাবি করছে, তখন নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই যুদ্ধে আসলে কোনো পক্ষেরই নিরঙ্কুশ বিজয় হয়নি। বরং ধ্বংস হয়েছে হাজারো প্রাণ, পঙ্গু হয়েছে অর্থনীতি এবং চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বিশ্বশান্তি।

আসলে বিজয় তাদেরই হবে, যারা এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তর করতে পারবে। ইসলামাবাদে শুক্রবারের বৈঠকটি কেবল দুই দেশের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে। সাধারণ মানুষ এখন কোনো দেশের ‘কূটনৈতিক বিজয়’ বা ‘সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ দেখতে চায় না; তারা চায় একটি বিপদমুক্ত পৃথিবী, যেখানে যুদ্ধের দামামা নয়, বরং শান্তির সুবাতাস বইবে।

পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের ‘চূড়ান্ত বিজয়’ এবং ইরানের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ এই দুই দাবির মাঝখানে প্রকৃত সত্য হলো, যুদ্ধ কখনোই সমাধান নয়। যদি এই দুই সপ্তাহের বিরতি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে না পৌঁছায়, তবে সামনের দিনগুলোতে ইরান সভ্যতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে পারে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে শুক্রবারের ইসলামাবাদের দিকে সেখানে কি শান্তির শ্বেত কপোত উড়বে, নাকি আবার যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠবে?

এএন