পৃথিবী ভ্রমণের স্বপ্ন অনেকেই দেখেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে বেশিরভাগ মানুষই নির্ভর করেন আধুনিক যানবাহনের ওপর। তবে ব্যতিক্রম এক মানুষ প্রমাণ করে চলেছেন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে শুধু পায়ের শক্তিতেই জয় করা যায় পৃথিবীর দীর্ঘতম পথ। তিনি ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি, যিনি প্রায় ২৭ বছর ধরে পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণের এক অনন্য ইতিহাস গড়ার পথে রয়েছেন।
১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার চিলির পুন্তা অ্যারেনাস শহর থেকে শুরু হয়েছিল তার এই দুঃসাহসিক যাত্রা। লক্ষ্য ছিল একটাই কোনো ধরনের মোটরচালিত যান ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে নিজের জন্মস্থান ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়া। তিনি এই অভিযানের নাম দেন “গোলিয়াথ এক্সপিডিশন”, যা এখন বিশ্বের দীর্ঘতম পদযাত্রাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
কার্ল বুশবির জন্ম ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ডের হাল শহরে। তরুণ বয়সে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্যারাট্রুপার হিসেবে প্রায় এক দশক কাজ করেন। কঠোর সামরিক জীবন তাকে শিখিয়েছিল কিভাবে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে হয় এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস জোগায়।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি নিজের জীবনে ব্যতিক্রম কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে শুরু হলেও পরে সেটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় মিশনে পরিণত হয়।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ৩১ হাজার মাইলের বেশি পথ অতিক্রম করেছেন এবং ২৫টির বেশি দেশ পায়ে হেঁটে পার হয়েছেন। তার যাত্রাপথে ছিল ঘন জঙ্গল, বরফাচ্ছন্ন অঞ্চল, মরুভূমি এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা।
দক্ষিণ আমেরিকার দুর্গম পথ পেরিয়ে তিনি মধ্য আমেরিকা হয়ে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছান। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা অতিক্রম করে তিনি পৌঁছান আলাস্কায়। সেখান থেকে শুরু হয় তার জীবনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায় বরফে জমে থাকা বেরিং প্রণালী পার হওয়া।
২০০৬ সালে তিনি আলাস্কা থেকে রাশিয়া পর্যন্ত জমে থাকা বরফের ওপর দিয়ে হাঁটেন। তীব্র ঠান্ডা, ভাঙা বরফ এবং বন্য প্রাণীর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই পথ পাড়ি দেওয়া ছিল তার সাহসিকতার অন্যতম প্রমাণ।
শুধু প্রকৃতির বাধাই নয়, তাকে লড়তে হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতার সঙ্গেও। রাশিয়ায় প্রবেশের সময় ভিসা সমস্যার কারণে তাকে আটক করা হয়। এমনকি কিছু সময় তাকে জেলেও থাকতে হয়েছিল।
ভিসা জটিলতা, অর্থসংকট এবং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তার যাত্রা একাধিকবার থেমে যায়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও তাকে দীর্ঘ বিরতি নিতে হয়। তবুও তিনি তার লক্ষ্য থেকে একচুলও সরে যাননি।
এই দীর্ঘ পথচলায় কার্ল বুশবি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন তা হলো মানুষের মানবিকতা। বিভিন্ন দেশে অচেনা মানুষ তাকে খাবার দিয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন এবং অনেক সময় আর্থিক সহায়তাও করেছেন।
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এই যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে যে পৃথিবী এখনো ভালো মানুষের জন্যই টিকে আছে।”
দীর্ঘ সময় একা হাঁটা তার জন্য সহজ ছিল না। কখনো কখনো দিনের পর দিন তাকে এমন এলাকায় হাঁটতে হয়েছে যেখানে মানুষের কোনো উপস্থিতি ছিল না।
মানসিক চাপ, একাকীত্ব এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে গেছেন। তার মতে, শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক দৃঢ়তা এই যাত্রায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
যখন তিনি যাত্রা শুরু করেন তখন পৃথিবী ছিল ভিন্ন। তখন স্মার্টফোন ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। এখন তিনি এমন এক পৃথিবীতে হাঁটছেন যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
এই পরিবর্তন তার কাছেও বিস্ময়কর লেগেছে। তিনি বলেন, যাত্রার শুরুতে যেখানে মানচিত্র আর কম্পাস ছিল তার ভরসা, এখন সেখানে জিপিএস ও অনলাইন যোগাযোগ বড় সহায়ক।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কার্ল বুশবি এখন ইউরোপের শেষ অংশ অতিক্রম করে ইংল্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যেই তিনি তার যাত্রা সম্পন্ন করতে পারবেন।
যদি তিনি সফলভাবে নিজের শহরে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে তিনি ইতিহাসে স্থান করে নেবেন এমন একজন মানুষ হিসেবে যিনি প্রায় তিন দশক ধরে পায়ে হেঁটে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছেন।
যাত্রা শেষ হওয়ার পর তিনি বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে চান। তিনি তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিতে চান এবং বিজ্ঞান ও অনুসন্ধিৎসা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কার্ল বুশবির গল্প শুধু একটি ভ্রমণ কাহিনী নয়, এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। এটি প্রমাণ করে স্বপ্ন যদি স্পষ্ট থাকে এবং মনোবল দৃঢ় হয়, তাহলে দীর্ঘ পথও অতিক্রম করা সম্ভব।
তার গল্প হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের পথ যত কঠিনই হোক, থেমে না গেলে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।
কার্ল বুশবির এই যাত্রা শেষ হলে সেটি শুধু একজন মানুষের বাড়ি ফেরা হবে না, বরং এটি হবে অধ্যবসায়, সাহস এবং মানবিক শক্তির এক অনন্য উদাহরণ।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন