ইসলামাবাদে ইরান-মার্কিন শান্তি আলোচনা: মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে নতুন মোড়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৭:২৪ এএম
ইসলামাবাদে ইরান-মার্কিন শান্তি আলোচনা: মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে নতুন মোড়

দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা মধ্যরাতেও অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের অস্থিরতা নিরসনে এই বৈঠককে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসলামাবাদের রাজপথে যখন সুরক্ষিত কনভয়গুলোর যাতায়াত বাড়ছে, তখন বিশ্ববাসীর নজর এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা সম্ভব হয়েছে মূলত উভয় পক্ষের সদিচ্ছা এবং প্রতিনিধিদের উচ্চপদস্থ মর্যাদার কারণে। এর আগে অনেকবার আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি, কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন।

আমাদের আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রধান সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, এই আলোচনার সাফল্যে তিনটি বিষয় মূল ভূমিকা পালন করছে। প্রথমত, প্রতিনিধিদলের ক্ষমতা। দুই পক্ষ থেকেই এমন ব্যক্তিদের পাঠানো হয়েছে যাদের সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সরাসরি আলোচনা। পর্দার আড়ালে বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বার্তার বদলে সরাসরি টেবিলে বসে কথা বলছেন দুই দেশের নীতিনির্ধারকরা। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। তেহরান এবং ওয়াশিংটন, উভয় পক্ষই চলমান সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান চায় বলে মনে হচ্ছে।

এই আলোচনার গুরুত্ব বোঝা যায় এতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের তালিকায় নজর দিলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন। একজন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ইরানের একজন প্রভাবশালী নেতার সরাসরি উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, উভয় দেশই এই আলোচনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

শান্তি আলোচনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর অপেক্ষায়, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হোক বা না হোক, তাতে তার ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিশেষ আসে যায় না। ট্রাম্পের ভাষায়, চুক্তি হোক বা না হোক, তাতে আমার কোনো পার্থক্য নেই। যাই ঘটুক না কেন, শেষ পর্যন্ত আমরাই অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হবো। এই মন্তব্যটি মূলত ঘরোয়া রাজনীতির কথা মাথায় রেখে করা বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প একদিকে যেমন শান্তির পথ খোলা রাখছেন, অন্যদিকে চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলেও নিজের শক্তির অবস্থান বজায় রাখতে চাইছেন। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের এই অনমনীয় মনোভাব আলোচনার টেবিলে মার্কিন প্রতিনিধিদের জন্য আরও বেশি দর কষাকষির সুযোগ করে দিতে পারে।

আমাদের কূটনৈতিক সংবাদদাতার মতে, আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কঠিন অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। যার মধ্যে প্রধান হলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। ইরান চাচ্ছে তাদের ওপর আরোপিত সকল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক, বিশেষ করে তেল রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে বাধা তুলে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এমনভাবে সীমাবদ্ধ করা হোক যেন তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক প্রভাব। লেবানন, ইয়েমেন এবং সিরিয়ায় ইরানের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সীমিত করার দাবি জানিয়েছে ওয়াশিংটন। চতুর্থত, নিরাপত্তা গ্যারান্টি। ইরান ভবিষ্যতের জন্য এমন এক গ্যারান্টি চাচ্ছে যেন পরবর্তী কোনো মার্কিন সরকার এই চুক্তি থেকে সরে না আসে।

শান্তি আলোচনার সমান্তরালে পারস্য উপসাগরেও উত্তাপ বাড়ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে যে, তাদের দুটি নৌ ধ্বংসকারী জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করেছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো সমুদ্রে পাতা মাইন পরিষ্কার করা এবং নৌ চলাচল নিরাপদ করা। তবে ইরান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে মাইন পরিষ্কার করার কোনো প্রয়োজন নেই এবং মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধি নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা বিভ্রান্তিকর। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আলোচনার পরিবেশে কিছুটা ছায়া ফেললেও মূল বৈঠক এখনো স্থবির হয়ে পড়েনি।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অপর প্রান্তে ইসরায়েল এখনো লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রেখেছে। তবে ইসলামাবাদে যখন ইরান-মার্কিন আলোচনা চলছে, তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিছুটা ভিন্ন সুর ধরেছেন। নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, তিনি লেবাননের সাথে এমন একটি শান্তি চুক্তি চান যা স্থায়ী হবে। তবে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, হিজবুল্লাহর হুমকি সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এবং ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক তৎপরতা বন্ধ হবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামাবাদে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে কোনো সমঝোতা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে লেবানন ও গাজা সীমান্তেও।

পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে ইরান এবং সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের জন্য এই আলোচনা আয়োজন করা একটি বিশাল কূটনৈতিক পরীক্ষা। যদি এই আলোচনা থেকে কোনো ইতিবাচক ফলাফল বেরিয়ে আসে, তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ইমরান খান পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের বর্তমান সরকার বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

ইসলামাবাদের এই দীর্ঘ রাতটি হয়তো বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বদলে দিতে পারে। একদিকে ট্রাম্পের জয় পরাজয়ের হিসেব, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষের শান্তির আকাঙ্ক্ষা। যদি জেডি ভ্যান্স এবং মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, তবে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা কূটনৈতিক সাফল্য। তবে ইতিহাস বলে, তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে আস্থার অভাব এতটাই গভীর যে, এক রাতেই সব মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবুও, তারা যে একে অপরের সাথে এক টেবিলে বসে রাতভর কথা বলছেন, সেটাই একটি বড় প্রাপ্তি।

জেএইচআর