ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলকে ঘিরে এখন বিশ্বের নজর। গভীর রাত পেরিয়ে ভোর হলেও ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা থামার কোনো লক্ষণ নেই। গত কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের এই প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠকটি এমন এক সময় হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এক সুতোয় ঝুলছে। শনিবার গভীর রাতেও যখন দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে অনড়, তখন বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বাড়ছে কৌতূহল। এই ঐতিহাসিক আলোচনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো।
শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই শান্তি আলোচনায় তথ্যের প্রবাহের ওপর অত্যন্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী হোটেল এলাকা ঘিরে নিরাপত্তার এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করেছে। আলোচনার ভেতর থেকে খুব সামান্য তথ্যই বাইরে আসছে। নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে ইসলামাবাদে রেড জোনসহ হোটেলের আশপাশে জনসাধারণের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। কঠোর গোপনীয়তা সত্ত্বেও বিভিন্ন সূত্র থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য বাইরে আসছে, তবে তা কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। আলোচনা কি আজই শেষ হবে নাকি দ্বিতীয় দিনে গড়াবে, তা নিয়ে ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত সাংবাদিকরা অন্ধকারে ছিলেন।
রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকে বড় ধরনের অগ্রগতি হলেও কিছু বিষয়ে দুই পক্ষই তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। বিশেষ করে লেবানন ইস্যু এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনার গতি কমিয়ে দিচ্ছে। লেবানন যুদ্ধবিরতি নিয়ে মার্কিন অবস্থান হলো তারা এটিকে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করতে চায় না, অপরদিকে ইরান লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করাকে শর্ত হিসেবে দেখছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে নারাজ, বিপরীতে ইরান তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অধিকারের স্বীকৃতি চায়। হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য এটি উন্মুক্ত রাখা জরুরি বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজস্ব শর্ত বজায় রেখেছে।
শান্তি আলোচনায় বসা সত্ত্বেও দুই দেশের নেতারাই নিজ দেশে বিজয়ী হিসেবে নিজেদের জাহির করার চেষ্টা করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে যে, তাদের সামরিক শক্তির চাপেই ইরান আলোচনার টেবিলে এসেছে। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধিরা প্রচার করছেন যে, তারা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। এই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর থেকে প্রকৃত সত্য আলাদা করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই দুই পরাশক্তিকে একই ছাদের নিচে আনতে যে কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়েছেন, তা প্রশংসিত হচ্ছে। পাকিস্তান কেবল মধ্যস্থতা করছে না, বরং একটি দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
ইসলামাবাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আবহে সাংবাদিকরা এখন তথ্য পাওয়ার জন্য মরিয়া। রাত ৩টা পেরিয়ে ভোর হলেও সেরেনা হোটেলের বাইরে সংবাদকর্মীদের ভিড় কমেনি। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতারা বলছেন, এটি কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। তথ্য কখন চুইয়ে পড়বে, সেই আশায় অনেকেই ঘুমহীন রাত কাটাচ্ছেন।
ইসলামাবাদের এই শান্তি আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়া একদিকে যেমন ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে দুই পক্ষের মধ্যকার গভীর মতভেদের চিত্রও ফুটিয়ে তোলে। এই দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে শেষ পর্যন্ত কী বেরিয়ে আসে এবং দুই দেশের প্রতিনিধিরা দেশে ফিরে নিজ নিজ জনগণকে কী বার্তা দেন, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বিশ্বশান্তি। তবে আপাতত, ইসলামাবাদের নিস্তব্ধ ভোরে কেবল দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর কাটছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন