ইসলামাবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার খবর যখন তেহরানে পৌঁছাল, তখন শহরের আকাশজুড়ে ছিল এক গুমোট ভাব। কয়েক দশকের শত্রুতা আর অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙার যে ক্ষীণ চেষ্টা পাকিস্তান সফররত প্রতিনিধি দলগুলো করেছিল, তা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র কিন্তু প্রধানত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
তেহরানের রাজপথ থেকে শুরু করে কফি শপ, সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন, এরপর কী? তবে এই প্রশ্নের উত্তরের চেয়ে মানুষের কণ্ঠে ঝরে পড়ছে গভীর অবিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশা।
তেহরানের সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, তা হলো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি চরম অনীহা এবং অবিশ্বাসের সংস্কৃতি। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের সাথে আলাপকালে দেখা গেছে, তারা কেউই এই আলোচনা থেকে খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না।
ইরানিদের মতে, এটি প্রথমবার নয় যে তেহরান ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার টেবিলে বসেছে। ২০০৩ সালের পরমাণু আলোচনা থেকে শুরু করে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক জেসিপিওএ চুক্তি, ইরান বারবার পশ্চিমা বিশ্বের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে।
কিন্তু ২০১৮ সালে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা এবং পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ইরানি জনগণের মনে এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি করেছে যে, ওয়াশিংটনের দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই স্থায়ী নয়। তেহরানের এক প্রবীণ অধিবাসী বলেন, আমরা অনেকবার এই খেলা দেখেছি।
তারা হাসিমুখে কথা বলে, কিন্তু দিনশেষে আমাদের ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগ করে। বিশ্বাস এমন একটি জিনিস যা একবার ভেঙে গেলে তা জোড়া লাগানো প্রায় অসম্ভব।
ইসলামাবাদে যখন শান্তি আলোচনার তোড়জোড় চলছিল, তখন ইরানের একটি বিশাল অংশের মানুষের মনে সুপ্ত আশা ছিল যে, অন্তত একটি যুদ্ধবিরতি বা সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের ঘোষণা আসবে।
বিশেষ করে লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তে বাড়তে থাকা সংঘাত এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানিরা শান্ত পরিবেশ আশা করেছিল। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চূড়ান্ত অফার এবং তেহরানের তা প্রত্যাখ্যান করার ফলে সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে।
মানুষের ভয় এখন আরও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা ইরানকে সরাসরি কোনো বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ এখন উদ্বিগ্ন।
রাজনীতি এবং কূটনীতির বাইরে ইরানিদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো তাদের পকেট। গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে ইরানের অর্থনীতি এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রিয়ালের মান ক্রমাগত কমতে থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিদেশি বিনিয়োগ না আসায় শিক্ষিত তরুণ সমাজ আজ দিশেহারা। ঔষধ থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল, সবকিছুর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ছায়া ইরানিদের জীবনযাত্রার মানকে তলানিতে নিয়ে ঠেকেছে।
তেহরানের বাজারের এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ভেবেছিলাম যদি চুক্তিটি হতো, তবে হয়তো আমাদের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা উঠত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমাদের আরও কয়েক বছর এই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। মানুষের কাছে এই আলোচনা কেবল ভূ-রাজনীতি নয়, বরং এটি ছিল তাদের ডাল-ভাতের সংস্থান করার একটি সম্ভাব্য পথ।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ব্যর্থ আলোচনা নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। কট্টরপন্থীরা এই ব্যর্থতাকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বন্ধু হতে পারে না এবং তাদের সাথে আলোচনায় যাওয়াটাই ছিল ভুল।
অন্যদিকে, সংস্কারপন্থীরা মনে করছেন যে, আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া ইরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ডেকে আনবে। তবে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও একটি জায়গায় সবাই একমত, দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য কেবল বহিঃশত্রু নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনাও দায়ী।
সাধারণ মানুষ মনে করে, সরকার যদি অর্থনীতির হাল না ধরে এবং কেবল বিদেশের সাথে শত্রুতা বজায় রাখে, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে।
ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান এখন তার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলে কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিশাল বিক্ষোভ এবং ইসরায়েলি হামলা প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের ছায়াযুদ্ধ এখনই থামছে না।
ইরান হয়তো এখন রাশিয়ার সাথে তাদের সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে পারে এবং চীনের সাথে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক চুক্তির ওপর জোর দিতে পারে, যাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা কমানো যায়।
ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান ত্যাগ এবং জেডি ভ্যান্সের কঠোর মন্তব্য কূটনৈতিক দরকষাকষির একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। কিন্তু ইরানের জনগণের জন্য এটি কেবল একটি অধ্যায় নয়, বরং তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের নতুন এক চ্যালেঞ্জ। তেহরানের রাস্তায় চলতে গেলে দেখা যায় মানুষের চোখে ক্লান্তি।
তারা যুদ্ধ চায় না, তারা চায় একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি। কিন্তু যখন ওয়াশিংটন চূড়ান্ত অফার দেয় এবং তেহরান তাকে অত্যধিক দাবি বলে প্রত্যাখ্যান করে, তখন মাঝখানে পিষ্ট হয় সাধারণ মানুষ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, কেবল আলোচনা করলেই শান্তি আসে না, তার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার পরিবেশ। তেহরানের সাধারণ মানুষ এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।
যদি অদূর ভবিষ্যতে কোনো অলৌকিক কিছু না ঘটে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব বিশ্ব রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে পিষ্ট ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে এখন একটাই চাওয়া, একটি স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু ইসলামাবাদ থেকে তেহরান, সর্বত্রই এখন আস্থার খরা। এই খরা কবে কাটবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। সূত্র: তেহরান
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন