ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

হরমুজ প্রণালী ‍‍`অবরোধ‍‍` এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার ব্যর্থতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম
হরমুজ প্রণালী ‍‍`অবরোধ‍‍` এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার ব্যর্থতা

একটি নাটকীয় মোড় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অভিমুখে আসা বা সেখান থেকে বের হওয়া সমস্ত জাহাজকে অবরোধ করবে। 

ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরই এই কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা এল। ইসলামাবাদে কয়েক দিনব্যাপী এই আলোচনার সমাপ্তি ঘটেছে কোনো ফলাফল ছাড়াই। ইতিমধ্যে সেখানকার রাজপথ থেকে শান্তি আলোচনার বিলবোর্ডগুলো সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে আলোচনা চলছিল, তা নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে সরাসরি জানিয়েছেন যে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় এই আলোচনা কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। 

অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধি দলের প্রধান জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ আলোচনার পরেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের বিশ্বাস অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের মতে, ওয়াশিংটনের প্রস্তাবগুলো একপাক্ষিক এবং তাতে ইরানের সার্বভৌমত্বের কোনো সম্মান ছিল না। এই আস্থার অভাবই মূলত আলোচনার টেবিলে একটি বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুট বা সমুদ্রপথ। কেন ট্রাম্পের এই অবরোধের ঘোষণা বিশ্বজুড়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বেশ কিছু কারণে স্পষ্ট হয়। বিশ্বের মোট উত্তোলিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। 

যদি এই পথটি অবরোধ করা হয়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যার ফলে উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছাবে। এই প্রণালীটি ওমান এবং ইরানকে পৃথক করেছে এবং পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। ইরানের উপকূলরেখা বরাবর এই পথটি হওয়ায় ইরানও এই পথে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প এখন এক কঠিন চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সামনে মূলত দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, সংঘাত বৃদ্ধি করা। হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ কার্যকর করার অর্থ হলো সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হওয়া। মার্কিন নৌবাহিনী যদি কোনো ইরানি বা আন্তর্জাতিক জাহাজ আটকানোর চেষ্টা করে, তবে ইরান চুপ করে থাকবে না। 

এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, পুনরায় আলোচনা করা। অবরোধের হুমকি দিয়ে ইরানকে চাপের মুখে রাখা এবং নতুন কোনো শর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে ইরানের বর্তমান অনমনীয় মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, নিকট ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ইরানের সাথে এই উত্তেজনার মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ফ্রন্টেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে একটি পৃথক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরান যেহেতু হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থক, তাই হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অবরোধের প্রভাব লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তেও গিয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের পরিকল্পনা লেবানন ও ইসরায়েলের আসন্ন আলোচনাকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখন দেখার বিষয়। লেবাননের বৈরুত থেকে সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন যে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণের কোনো বিরতি নেই, যা এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে।

বিশ্বের ভূ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এখন এর পর কী, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। চীনের মতো দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা এই অবরোধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে। পাশাপাশি ইরান হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপন বা ড্রোন হামলা চালিয়ে মার্কিন নৌবহরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো যেমন কাতার বা ওমান হয়তো মধ্যস্থতা করার শেষ চেষ্টা চালাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবরোধ করার হুমকি কেবল একটি সামরিক ঘোষণা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধের ডঙ্কা। যদি সত্যিই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব ইসলামাবাদ বা ওয়াশিংটনের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে। আপাতত ইসলামাবাদের সেই অপসারিত বিলবোর্ডগুলোই বলে দিচ্ছে যে শান্তির পথটি এখন অত্যন্ত বন্ধুর। সূত্র: বিবিসি

জেএইচআর