ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদ, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা এবং অনিশ্চয়তার মাঝেই এক নতুন আশার আলো দেখালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সপ্তাহান্তে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপের পর ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চলতি সপ্তাহেই তেহরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে।
নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী দুই দিনের মধ্যে বড় কিছু ঘটতে পারে। তিনি বলেন, আপনাদের ইসলামাবাদেই অবস্থান করা উচিত, কারণ পরবর্তী দুই দিনের মধ্যে কিছু একটা হতে পারে এবং আমরা সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও জানিয়েছেন যে, আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। পাকিস্তান, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারাও মনে করছেন যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধি দলগুলো চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে আবারও পাকিস্তানে বৈঠকে বসতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র এক নজিরবিহীন নৌ-অবরোধ শুরু করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই অবরোধের উদ্দেশ্য হলো ইরানের আয়ের প্রধান উৎস তেলের রাজস্ব বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরান যে টোল আদায় করত, তা বন্ধ করা। বর্তমানে এক ডজনেরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় ১০,০০০ সৈন্য ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ বন্ধ করে রেখেছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, প্রথম ২৪ ঘণ্টার চিত্রে অন্তত ৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন নির্দেশে তাদের পথ পরিবর্তন করে ইরানি বন্দরে ফিরে গেছে। তবে বিবিসি ভেরিফাই এর তথ্যমতে, কিছু জাহাজ এই অবরোধের মধ্যেও হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে, যার মধ্যে চারটি ইরানের সাথে যুক্ত এবং তিনটি অন্যান্য দেশের জাহাজ।
ইসলামাবাদে গত সপ্তাহান্তের আলোচনা কেন ভেস্তে গিয়েছিল, তার নেপথ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মূল দ্বন্দ্বের জায়গাগুলো হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তেহরান এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ মাত্র ৫ বছর করার পাল্টা প্রস্তাব দেয়।
এই মতপার্থক্যই আলোচনার পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছিল, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়। যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। তবে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে কিছুটা স্বস্তি এসেছে।
মঙ্গলবার তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অবশ্য বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য এই সামান্য অর্থনৈতিক কষ্টটুকু মেনে নেওয়া মূল্যবান।
এদিকে চীন মার্কিন এই নৌ-অবরোধকে বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে অভিহিত করেছে। বেইজিং মনে করে, এই পদক্ষেপ ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে। ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ওয়াশিংটনে মঙ্গলবার ইসরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে একটি বিরল ও ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা শুরু হয়।
যদিও হোয়াইট হাউজ স্পষ্ট করেছে যে, পাকিস্তানের আলোচনা এবং ওয়াশিংটনের ইসরায়েল ও লেবানন আলোচনার মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই, তবে লেবাননের রাষ্ট্রদূত এই বৈঠককে উৎপাদনশীল বলে বর্ণনা করেছেন এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত একে শান্তির নতুন যুগ বলে অভিহিত করেছেন।
ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে রেখেছে, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি লাইফলাইন। যদি ট্রাম্পের ইঙ্গিত অনুযায়ী আগামী দুই দিনের মধ্যে ইসলামাবাদে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের আলোচনার টেবিলের দিকে। তথ্যসূত্র: রয়টার্স।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন