ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত: ট্রাম্পের হুশিয়ারি ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত: ট্রাম্পের হুশিয়ারি ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনীতি

তেহরান ও ওয়াশিংটন, দীর্ঘ উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের পর ইরান সরকার কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে ইরানের এই ইতিবাচক বার্তার বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, একটি স্থায়ী এবং কার্যকর চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে।


‎ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, চলমান যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে। এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। ইরানের এই সিদ্ধান্তের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

উল্লেখ্য যে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বের মোট উত্তোলিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওমান এবং ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল।
‎ইরানের এই ঘোষণার কয়েক মুহূর্ত পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বড় অক্ষরে লিখেন, ধন্যবাদ! তবে এই আপাত ইতিবাচক বার্তার পরপরই তিনি কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

ট্রাম্প জানান, হরমুজ প্রণালী ইরান খুলে দিলেও ইরানের নিজস্ব বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর যে অবরোধ বা ব্লকেড রয়েছে, তা এখনই তুলে নেওয়া হবে না। একটি নতুন এবং কঠোর ডিল বা চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ বলবৎ থাকবে। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা। ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী নীতি, একদিকে ইরানকে ধন্যবাদ জানানো এবং অন্যদিকে কঠোর অবরোধ বজায় রাখা, মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশলেরই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

‎এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য প্রান্তে একটি বড় ধরণের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দীর্ঘ ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে ইসরায়েল এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে। যুদ্ধবিরতি শুরুর পরপরই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের রাস্তায় সাধারণ মানুষ নেমে আসে। আতশবাজি ও উল্লাসের মাধ্যমে তারা এই ক্ষণস্থায়ী শান্তিকে স্বাগত জানায়। গত ছয় সপ্তাহের ভয়াবহ সংঘর্ষে লেবাননের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সরকারি হিসাব মতে, এই সময়ে ২,০০০ এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রতি পাঁচজন লেবানীয়র মধ্যে একজন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, এই সংঘর্ষে তাদের ২ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১৩ জন সৈন্য নিহত হয়েছেন।

‎ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাঙ্ক গার্ডনারের মতে, এই ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নাজুক বা ভঙ্গুর। এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত আস্থার সংকট, ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষই একে অপরকে চরম অবিশ্বাস করে। যে কোনো ছোটখাটো উস্কানি এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত শর্তসাপেক্ষ শান্তি, এই যুদ্ধবিরতি মূলত একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। যদি ১০ দিনের মধ্যে কোনো পক্ষ শর্ত ভঙ্গ করে, তবে পুনরায় ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। তৃতীয়ত আঞ্চলিক স্বার্থ, ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ এই পরিস্থিতির সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।

‎ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার খবরটি প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, যদি জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তবে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে মার্কিন নৌ-অবরোধ চলতে থাকলে ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি যেন একটি বারুদের স্তূপ, যেখানে একদিকে শান্তির ক্ষীণ আশা এবং অন্যদিকে প্রবল ভূ-রাজনৈতিক চাপ বিদ্যমান। ১১ মার্চ ২০২৬ এ সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল-খাইমাহ থেকে তোলা মালবাহী জাহাজের ছবিগুলো মনে করিয়ে দেয় যে, এই সংঘাত কেবল সামরিক নয়, বরং এটি বৈক্সিক বাণিজ্যের জীবনরেখাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে।

এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, ইরান কি ট্রাম্পের শর্ত মেনে নতুন কোনো চুক্তিতে আসবে, নাকি হরমুজ প্রণালীকে আবারও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে? আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জেএইচআর