মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা, প্রগতি সত্ত্বেও চূড়ান্ত চুক্তির পথে পাহাড়সম বাধা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা, প্রগতি সত্ত্বেও চূড়ান্ত চুক্তির পথে পাহাড়সম বাধা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা কি তবে কাটতে চলেছে, নাকি এটি কেবল এক বড় ঝড়ের আগের স্তব্ধতা? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি যখন সমাপ্তির পথে, তখন দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা মন্তব্যগুলো বিশ্ববাসীকে এক মিশ্র সংকেত দিচ্ছে। 

ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন যে, শান্তি আলোচনায় কিছু ‘প্রগতি‘ বা উন্নতি হয়েছে, তবে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে দুই দেশ এখনো ‘অনেক দূরে‘ অবস্থান করছে।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সাথে ‘খুব ভালো আলোচনা‘ চলছে। তবে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান যেন ওয়াশিংটনকে ‘ব্ল্যাকমেইল‘ বা জিম্মি করার চেষ্টা না করে।

ইরানের শক্তিশালী সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, যিনি ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি বাস্তবধর্মী চিত্র তুলে ধরেছেন। শনিবার তেহরানে এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘আলোচনায় কিছু অগ্রগতি অবশ্যই হয়েছে, কিন্তু আমাদের মধ্যে এখনো অনেক বড় ফাঁক রয়ে গেছে। কিছু মৌলিক বিষয়ে সমঝোতা হওয়া এখনো বাকি।

গালিবাফের এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান কেবল তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই কোনো চুক্তিতে সই করবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়ে আলোচনায় বসেনি, বরং নিজেদের দাবি আদায় করতেই তারা এই পথ বেছে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গালিবাফের এই "ধীরে চলো" নীতি আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল, যাতে ইরান আরও বেশি ছাড় আদায় করতে পারে।

ট্রাম্পের অবস্থান: আলোচনা ও হুঁশিয়ারির দোলাচল

হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এক গুরুত্বপূর্ণ সভার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সেখানে তার পাশে ছিলেন স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র এবং এফডিএ কমিশনার মার্টিন মাকারি। ট্রাম্প আলোচনার পরিবেশ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও তার তর্জনী ছিল তেহরানের দিকে।

ট্রাম্প বলেন, আমরা ইরানের সাথে কথা বলছি। খুব ভালো কিছু কথা হচ্ছে। কিন্তু তারা যদি মনে করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে আমাদের ব্ল্যাকমেইল করবে, তবে তারা ভুল ভাবছে।ট্রাম্পের মতে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ইরানের সাথে ‘শতভাগ লেনদেন" বা চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে। ট্রাম্পের এই অনমনীয় মনোভাব ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, কারণ তেহরান এই অবরোধকে ‘যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন‘ হিসেবে দেখছে।

হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন নিয়ে দড়ি টানাটানি

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার 'হরমুজ প্রণালী'। ইরান ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে না নিচ্ছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে। ইরানের সামরিক কমান্ডের মতে, তাদের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ জারি রেখে শান্তি আলোচনা অর্থহীন।

গত কয়েক দিনে এই এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। খবর পাওয়া গেছে যে, অন্তত দুটি ইরানি গানবোট হরমুজ প্রণালীতে একটি ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেছে। এছাড়া অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ ‘!অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল‘ বা ক্ষেপণাস্ত্র সদৃশ বস্তুর আঘাত পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, যুদ্ধবিরতি চললেও সমুদ্রপথে ছায়াযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।

মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা এবং লিস ডুসেটের পর্যবেক্ষণ

বিবিসি-র প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিস ডুসেট বর্তমানে তেহরানে অবস্থান করছেন। এই ঘনঘোর অন্ধকারের মধ্যেও তিনি কিছুটা আশার আলো দেখছেন। তার মতে, ‘এই পরিস্থিতির মধ্যে একমাত্র আশার আলো হলো— মধ্যস্থতাকারীরা এখনো নিরবচ্ছিন্নভাবে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছেন।

পাকিস্তান ও কাতার এই আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইসলামাবাদে গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে, তাকে আধুনিক কূটনীতির অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও কোনো চূড়ান্ত দলিল স্বাক্ষরিত হয়নি, তবে দুই পক্ষই একে অপরের প্রস্তাবগুলো "পর্যালোচনা" করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব ও ইরানের প্রতিক্রিয়া

ওয়াশিংটন সম্প্রতি তেহরানের কাছে একটি নতুন প্রস্তাবের খসড়া পাঠিয়েছে। ইরান জানিয়েছে, তারা বর্তমানে এই প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখছে। এই প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো হলো:

  • ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নতুন করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
  • আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধ (যেমন ইয়েমেন ও সিরিয়া) থেকে ইরানের সমর্থন প্রত্যাহার।
  • বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

তবে ইরান পাল্টা দাবি করেছে যে, কোনো আলোচনার আগেই তাদের তেল রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করতে হবে এবং মার্কিন নৌবাহিনীকে পারস্য উপসাগর থেকে পিছু হটতে হবে।

ভারতের উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের ওপর। ভারতের পতাকাবাহী জাহাজ 'জগ অর্ণব' ও 'সানমার হেরাল্ড' আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বড় ধাক্কা। ভারত ইতোমধ্যেই তেহরানের কাছে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। যদি বুধবারের মধ্যে কোনো সমাধানে পৌঁছানো না যায় এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ভারতের মতো আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতি ধসিয়ে দিতে পারে।

পরবর্তী পদক্ষেপ: যুদ্ধ নাকি শান্তি?

আগামী বুধবার যখন এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হবে, তখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে পুরো বিশ্ব উদ্বিগ্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়ে রেখেছেন যে, চুক্তি না হলে তিনি আবারও ‘বোমা বর্ষণ‘শুরু করবেন। অন্যদিকে, ইরানও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও আঞ্চলিক শক্তি প্রদর্শন করতে প্রস্তুত।

গালিবাফের ভাষায়, আমরা চূড়ান্ত আলোচনার অনেক দূরে।এই দূরত্ব ঘোচাতে হলে দুই পক্ষকেই বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'আর্ট অফ দ্য ডিল' কি শেষ পর্যন্ত সফল হবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দাবানলে পুড়ে ছারখার হবে?

কূটনীতির অগ্নিপরীক্ষা

মার্কিন-ইরান সম্পর্ক এখন এক সরু সুতোর ওপর ঝুলে আছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনমনীয় ব্যক্তিত্ব এবং 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি, অন্যদিকে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক প্রভাব রক্ষার লড়াই। ইসলামাবাদ থেকে ওভাল অফিস আলোচনার টেবিলগুলো এখন তপ্ত। লিস ডুসেট যেমনটা বলেছেন, বার্তা আদান-প্রদানই এখন একমাত্র ভরসা।

তবে রণক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা শান্তির বার্তাকে বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বুধবারের সময়সীমা পার হওয়ার আগে বিশ্ববাসী কেবল প্রার্থনাই করতে পারে যেন কূটনীতি যুদ্ধের ওপর জয়ী হয়।

এএন