ইরানে অনির্দিষ্টকালের জন্য হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
ইরানে অনির্দিষ্টকালের জন্য হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প
স্ট্রেইট অব হরমুজ, মুসান্দাম, ওমান অঞ্চলে জাহাজ ও নৌকা। ছবি: রয়টার্স

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী চলমান যুদ্ধের উত্তপ্ত আবহে এক নাটকীয় মোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিলেও, রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী'তে ইরানের হাতে দুটি জাহাজ জব্দের ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে।

মঙ্গলবার এক আকস্মিক ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করছেন। এর আগে তিনি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বেসামরিক অবকাঠামোতে বোমা হামলার হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে সেখান থেকে পিছিয়ে আসেন। ট্রাম্পের মতে, শান্তি আলোচনায় ইরানের দেওয়া একটি প্রস্তাব পর্যালোচনার সুযোগ দিতেই এই একতরফা যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছে।

তবে দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া আগের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ চলতি সপ্তাহের শুরুতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। বর্তমান স্থিতাবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না, কারণ ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর বা মেয়াদ বৃদ্ধির কথা জানায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা স্থগিতের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) হরমুজ প্রণালী থেকে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করে ইরানি উপকূলে নিয়ে যায়। জব্দকৃত জাহাজগুলো হলো:

 1. লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী 'এপামিনোন্ডাস' (Epaminondas)
 2. পানামার পতাকাবাহী 'এমএসসি ফ্রান্সেসকা' (MSC Francesca)

ইরানের আধাসামরিক সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম'-এর তথ্যমতে, জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পারমিট না থাকা এবং নেভিগেশন সিস্টেমে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া, লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী আরও একটি কন্টেইনার জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলেও সেটি কোনোমতে রক্ষা পেয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

মার্কিন মুখপাত্র লেভিট ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই ঘটনাকে ‘জলদস্যুতা‘হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, জাহাজগুলো মার্কিন বা ইসরায়েলি না হওয়ায় এই জব্দ করার ঘটনা টেকনিক্যালি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন নয়।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ সোশ্যাল মিডিয়ায় এক কড়া বার্তায় জানিয়েছেন যে, মার্কিন নৌ-অবরোধ বজায় রেখে যুদ্ধবিরতি অর্থহীন। তিনি এই অবরোধকে যুদ্ধেরই একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

কলিবাফ বলেন, আপনারা সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি, আর এখন গুণ্ডামি করেও তা পারবেন না। একমাত্র পথ হলো ইরানি জনগণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।

তিনি পরিষ্কার করে দেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের তেলের বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ পরিচালিত হয়। মার্কিন অবরোধের মতো ‘যুদ্ধবিরতির গুরুতর লঙ্ঘন‘ চলতে থাকলে এই রুট পুনরায় উন্মুক্ত করা সম্ভব নয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন দুই মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ের মধ্যে ইরান এবং লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষ করে লেবাননে ইরান-পন্থি হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়ছে।

যুদ্ধ ও অবরোধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের ভেতর মানবিক পরিস্থিতি শোচনীয়। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, ট্রাম্প যদি ভবিষ্যতে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা করেন, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন হবে।

বর্তমানে পাকিস্তান এই দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে আলোচনা এগোচ্ছে না। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলতে নারাজ, অন্যদিকে ইরান অবরোধ না তুললে কোনো আলোচনাতেই বসতে আগ্রহী নয়। এই ‘ডেডলক‘বা স্থবিরতা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি দিলেও, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের শক্ত অবস্থান এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ বজায় থাকা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যেকোনো সময় আবারও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

এএন