মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ‘সময়সীমা'‘নেই বলে ঘোষণা করেছেন।
অন্যদিকে, তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, মার্কিন নৌ-অবরোধ ও শর্ত লঙ্ঘনের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী‘পুনরায় উন্মুক্ত করা বর্তমানে ‘অসম্ভব‘।দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সাথে এই সংঘাত নিরসনের জন্য তিনি কোনো নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার বা সময়সীমা নির্ধারণ করছেন না। যদিও এর আগে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল এবং ট্রাম্প নিজেই হামলা স্থগিতের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তবে হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে যে বর্ধিত কোনো যুদ্ধবিরতির জন্য কোনো নতুন ‘ডেডলাইন‘বা চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
এই ঘোষণার মাধ্যমে ওয়াশিংটন কার্যত এটিই বুঝিয়ে দিল যে, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত না দেখছে, ততক্ষণ ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি জাহাজগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করছে এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে ইন্টারসেপ্ট (আটক বা নজরদারি) করছে, যা তেহরানকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
ইরানের প্রধান আলোচক এবং পার্লামেন্ট স্পিকার ‘মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী "লঙ্ঘন" করছে। কলিবাফ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যেভাবে নির্লজ্জভাবে চুক্তি ভঙ্গ করা হচ্ছে, তাতে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল রেখে তেহরান থেকে কোনো নমনীয়তা আশা করা ভুল। ইরানের প্রেসিডেন্ট ‘মাসুদ পেজেশকিয়ান‘একই সুর মিলিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা এবং ইরানের সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ওপর যে অবরোধারোপ করা হয়েছে, তা-ই শান্তি আলোচনার প্রধান বাধা।
গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইরান এই প্রণালী দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকারী তিনটি মালবাহী কার্গো জাহাজে আক্রমণ করেছে। এর মধ্যে দুটি জাহাজের ক্রু ও নাবিকদের আটক করে ইরানি ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই জাহাজগুলো হলো লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী 'এপামিনোন্ডাস' এবং পানামার পতাকাবাহী 'এমএসসি ফ্রান্সেসকা'।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে ‘জলদস্যুতা‘হিসেবে বর্ণনা করা হলেও ইরান একে তাদের সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা হিসেবে দাবি করছে। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এটি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান মুখোমুখি অবস্থানে, তখন এই সংঘাতের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। ইসরায়েল এবং লেবানন বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট ‘জোসেফ আউন‘জানিয়েছেন যে, তারা যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে উত্তরের সীমান্তে হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন লড়াই পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে রাখছে। পাকিস্তান বর্তমানে এই সংকটে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করলেও দৃশ্যত কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
রয়টার্সের উত্তর আমেরিকা প্রতিনিধি বিশ্লেষণ করেছেন যে, বর্তমানে দুই পক্ষই একটি ‘স্থবিরতা' (Stalemate)বা অচলাবস্থায় পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল: অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করানো।
ইরানের কৌশল: হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করা এবং অবরোধ প্রত্যাহারে বাধ্য করা।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মাঝে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেসামরিক মানুষ। বিশেষ করে ইরান ও লেবাননে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ঘরবাড়ি হারিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘হামলা স্থগিতের ‘ঘোষণা একটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান বা যুদ্ধ শেষের পরিকল্পনা না থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়ংকর ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন