পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক চড়াই-উতরাই দেখা গেছে, কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যেন সমস্ত অতীত রেকর্ড ভেঙে এক ‘হিচককীয় থ্রিলার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। চৈত্রের দাবদাহকেও হার মানিয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ।
এবারের লড়াই কেবল তৃণমূল বনাম বিজেপির নয়, বরং তা রূপ নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের এক ছায়াযুদ্ধে। রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে এখন একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- নির্বাচন কমিশন যদি হয় ‘বুনো ওল’, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিশ্চিতভাবেই ‘বাঘা তেঁতুল’।
২০২১ সালের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির ‘আব কি বার দুশো পার’ স্লোগান ব্যর্থ হয়েছিল তৃণমূলের অপ্রতিরোধ্য ঝড়ে। তবে পাঁচ বছর পর ২০২৬-এ এসে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার বিজেপির রণকৌশল কেবল জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং মাঠের খেলায় আম্পায়ার বা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। তৃণমূলের অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নিরপেক্ষতার আড়ালে কার্যত বিজেপি-শাহর ‘সুগ্রীব দোসর’ হিসেবে কাজ করছেন।
সংসদীয় রাজনীতির গত সাত দশকের ইতিহাসে কোনো রাজ্যের শাসক দলকে এভাবে কেন্দ্রীয় সংস্থার সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়তে দেখা যায়নি। জ্ঞানেশ কুমার বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) দিয়ে যে ‘প্রলয় নাচন’ শুরু করেছিলেন, তার চূড়ান্ত আঘাতটি এখন আছড়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে।
জ্ঞানেশ কুমারের প্রধান অস্ত্র হলো ‘এসআইআর’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভুয়া ভোটার ছেঁটে ফেলা। এই প্রক্রিয়ায় সারা দেশে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় ৫৮ লাখ নাম বাদ দেওয়ার পর বিতর্ক শুরু হয় আরও ৯১ লাখ ভোটারের নাম কাটা পড়লে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠোর প্রতিরোধের মুখে এবং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে সেই তালিকায় কিছু রদবদল হলেও, এখনো প্রায় ২৭ লাখ মানুষ ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যানসি’ বা যৌক্তিক অসংগতির ফাঁদে পড়ে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার দুশ্চিন্তায় এবং প্রশাসনিক চাপে রাজ্যে শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, এই মৃত্যুর দায় খোদ কমিশনের।
ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে কমিশনের কড়াকড়ি আরও বাড়ছে। প্রথম দফার ভোটের বেশ কয়েক দিন আগেই রাজ্যের সমস্ত পানশালা ও মদের দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন সিইসি। শুধু তাই নয়, স্থানীয় থানার কর্তৃত্ব কার্যত কেড়ে নিয়ে তা তুলে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে। পুলিশের অনুমতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় বাহিনী সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে এই সিদ্ধান্তকে তৃণমূল ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কলকাতার রাজনৈতিক আকাশে এখন ক্ষোভের কালো মেঘ। অভিযোগ উঠেছে, ভোটের আগে তৃণমূলের প্রায় ৮০০ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের ছক কষা হয়েছে। চার হাজার নামের একটি তালিকা তৈরি করে তাঁদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কঠোরতা বিজেপির জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও শাসক দলের কাছে তা চরম অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক।
পশ্চিমবঙ্গকে এবার ‘অসামাজিক ও অগণতান্ত্রিক’ তকমা দিয়ে নজিরবিহীন নজরদারিতে মুড়ে ফেলা হয়েছে। ৮৮ হাজার বুথে দুই লাখ সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করে কোথাও কোনো গড়বড় হচ্ছে কি না, তা সরাসরি কলকাতা ও দিল্লির কমান্ড সেন্টার থেকে দেখা যাবে। ২০টি স্ক্রিনে ২০০ জন পর্যবেক্ষক প্রতি মুহূর্তে নজর রাখছেন। লেখকের ভাষায়, গোটা পশ্চিমবঙ্গ যেন এখন বেহুলা-লখিন্দরের নিশ্ছিদ্র বাসরঘর, যেখানে কোনো ছিদ্র রাখার সুযোগ নেই।
এই সাঁড়াশি আক্রমণের মোকাবিলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের তাঁর পুরোনো ও পরীক্ষিত ‘আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ’-এর তাস খেলেছেন। লড়াইটাকে তিনি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্তরের ওপরে তুলে এনেছেন ‘বাঙালির মান-মর্যাদা বনাম বহিরাগত আগ্রাসন’-এর তত্ত্বে। একদিকে মোদি-শাহ এবং ইসির যুগলবন্দী, অন্যদিকে তৃণমূলের একক লড়াই।
তৃণমূলের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার এতটাই পক্ষপাতদুষ্ট যে তিনি এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন মুখ্যমন্ত্রীকে বৈঠকে ন্যুনতম সম্মানটুকুও দেখাননি। এই ব্যক্তিগত সংঘাত এখন নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, এটি এখন অস্তিত্বের লড়াই। জ্ঞানেশ কুমারের ‘লজিক্যাল’ শুদ্ধি অভিযান কি তৃণমূলের ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে পারবে? নাকি মমতার ‘বাঘা তেঁতুল’ রূপ সব ষড়যন্ত্রকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে আবারও সাফল্যের শিখরে পৌঁছাবে?
অতীত বলে, কোণঠাসা অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক এবং অপরাজেয়। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। একদিকে প্রযুক্তির নজরদারি আর আইনি কড়াকড়ি, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া রাজনৈতিক আবেগ। শেষ পর্যন্ত এই অসম লড়াইয়ের ফলাফল কী হবে, তা জানতে এখন গোটা দেশের নজর কেবল পশ্চিমবঙ্গ।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন