লেনা ও কেজতিলের বয়সের ব্যবধানে এক অন্যরকম প্রেম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
লেনা ও কেজতিলের বয়সের ব্যবধানে এক অন্যরকম প্রেম
লেনা কিয়েতিলের সঙ্গে নিজের জীবনের ছবি শেয়ার করা শুরু করেন, যাতে দেখানো যায় যে নারীরা কীভাবে কমবয়সী সঙ্গীর সঙ্গে ভালোবাসা খুঁজে পেতে পারেন

প্রেমে পড়লে কি বয়স কোনো বাধা হতে পারে? সমাজ বা লোকলজ্জার ভয়ে কি বিসর্জন দিতে হবে মনের টানকে? নরওয়ের লেনা ও কেজতিলের গল্পটি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ৪৫ বছর বয়সী লেনা যখন ৩০ বছর বয়সী কেজতিলের প্রেমে পড়েন, তখন তাঁর মনে হাজারো সংশয় ছিল। কিন্তু আজ দুই বছর পর, তাঁরা কেবল একসাথে সংসারই করছেন না, বরং সমাজের তথাকথিত ট্যাবু ভেঙে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

লেনা যখন ডেটিং অ্যাপে নিজের প্রোফাইল তৈরি করেন, তখন তিনি সচেতনভাবেই তাঁর বয়স গোপন রেখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন কোনো পুরুষ যেন কেবল তাঁর বয়স দেখে তাঁকে বিচার না করে বা তাঁর সাথে কথা বলার আগেই তাঁকে তালিকা থেকে বাদ না দেয়। সেখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় কেজতিলের। কয়েক সপ্তাহ ডেটিং করার পর যখন তাঁদের সম্পর্ক সিরিয়াস হতে শুরু করে, তখন লেনার উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

লেনা জানতেন কেজতিল কেবল সাময়িক কোনো সম্পর্ক (fling) নয়, বরং সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজছিলেন। লেনা বলেন, যখন আমাদের সম্পর্ক গভীর হতে শুরু করল, আমার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল। আমি ভাবছিলাম সে যখন জানবে আমার বয়স ৪৫, তখন হয়তো সে সব শেষ করে দেবে।

প্রথম ডেটেই লেনা কেজতিলকে জানিয়েছিলেন যে তাঁর একটি কিশোরী কন্যা রয়েছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, কেজতিল এতে মোটেও পিছু হটেননি। বরং তিনি ধরে নিয়েছিলেন লেনা হয়তো খুব কম বয়সেই মা হয়েছিলেন। কেজতিল বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম লেনা হয়তো আমার চেয়ে মাত্র কয়েক বছরের বড় হবে।

কিন্তু যখন লেনা সাহস করে সত্যিটা বললেন যে তাঁদের বয়সের ব্যবধান আসলে ১৫ বছর, তখন কেজতিল মোটেও বিচলিত হননি। বরং তিনি এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধের পরিচয় দিলেন। তিনি লেনার মেয়ের সাথে দেখা করলেন এবং তার কাছে জানতে চাইলেন যে সে তার মায়ের সাথে কেজতিলের ডেটিং করাটা ইতিবাচকভাবে দেখছে কি না। লেনার মেয়ে কেবল ১১ বছরের ছোট কেজতিলের চেয়ে, কিন্তু সে সানন্দে এই সম্পর্ক মেনে নেয়।

লেনা সবচেয়ে বেশি ভয়ে ছিলেন কেজতিলের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। তিনি কেজতিলকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁরা লেনার সঠিক বয়স কাউকে না বলেন। লেনার ভয় ছিল, সবাই হয়তো বলবে— কেন তুমি এক বুড়ি মহিলার সাথে প্রেম করছ?

তবে বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেজতিলের বন্ধুরা ছিল অত্যন্ত সহজ ও প্রাণখোলা। আর তাঁর বাবা-মা লেনা ও তাঁর মেয়েকে পরম মমতায় পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে নেন। কেজতিল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, যদি কেউ তাঁর সঙ্গিনীকে নিয়ে উপহাস করত, তবে তিনি সেই বন্ধুত্বের ইতি টানতেও দ্বিধাবোধ করতেন না।

লেনার মেয়ে কেবল তাঁদের সম্পর্ককে মেনে নেয়নি, বরং সে এই দুই প্রজন্মের মধ্যকার ব্যবধান ঘোচাতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কেজতিল ও তাঁর বন্ধুদের ব্যবহৃত আধুনিক 'স্ল্যাং' বা চলতি কথার অর্থ সে তার মাকে বুঝিয়ে দিত। সে তার মাকে বলেছিল, ‘কেজতিলও প্রাপ্তবয়স্ক এবং তুমিও। সে যদি তোমাকে ভালো রাখে, তবে আমার কোনো আপত্তি নেই।

গত দুই বছর ধরে লেনা ও কেজতিল একসাথে আছেন। লেনার মতে, কেজতিলের শান্ত স্বভাব লেনার আবেগপ্রবণ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনকে শান্ত রাখে। লেনা হাস্যরসে বলেন, কখনো কখনো মনে হয় কেজতিলই আমার চেয়ে বেশি ম্যাচিওর বা বড়, আর আমি শিশুসুলভ। যদিও মাঝেমধ্যে আমি একটু বেশি শাসন (bossy) করার চেষ্টা করি।

লেনা ও কেজতিল সম্প্রতি নরওয়ের স্টাভাঞ্জার শহরের কাছে একটি বাড়ি কিনেছেন। আগামী সপ্তাহেই তাঁরা নতুন এই বাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন। তাঁদের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে সঠিক বোঝাপড়া থাকলে বয়সের পার্থক্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

লেনা ও কেজতিল কেবল আবেগ দিয়ে চলেননি, বরং বাস্তবসম্মত বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করেছেন। নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক শো ‘এজ অফ অ্যাট্রাকশন’ (Age of Attraction) নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে তাঁরাও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। 

যেহেতু লেনা কেজতিলের চেয়ে আগে অবসরে (Retirement) যাবেন, তাই তাঁরা বাড়ির কিস্তি বা মর্টগেজ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি চমৎকার চুক্তি করেছেন। বর্তমানে লেনা বেশি টাকা বিনিয়োগ করছেন, আর কেজতিল দিচ্ছেন কম। তবে কেজতিল যখন অবসরে যাবেন, ততদিনে তাঁদের দুজনের মোট অবদান সমান হয়ে যাবে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কারণে যেন কোনো আধিপত্য তৈরি না হয়, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক। একজন সঙ্গী অন্যজনের অনেক আগেই বার্ধক্যজনিত সেবার প্রয়োজন বোধ করতে পারেন এই রূঢ় বাস্তবতাকেও তাঁরা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন।

লেনা ও কেজতিল এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁদের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো শেয়ার করেন। যদিও মাঝেমধ্যে নেতিবাচক মন্তব্য আসে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তাঁদের এই অসম সাহসী প্রেমকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

তাঁদের গল্পটি আমাদের শেখায় যে, জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে বয়স বা সামাজিক সংজ্ঞার চেয়েও বড় হলো পারস্পরিক সম্মান, সততা এবং একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা। লেনা আজ আর ভয় পান না; তিনি জানেন, কেজতিলের চোখে তিনি এক ‘বুড়ি মহিলা’ নন, বরং জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

এএন