নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ফলে কিছু দেশ বিদ্যুতের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি থেকে রক্ষা পাচ্ছে। গ্যাস-নির্ভর দেশ হিসেবে ইতালি এবং জার্মানি পাইকারি বিদ্যুতের বাজারে তীব্র অস্থিরতার সম্মুখীন হচ্ছে। সাধারণ পরিবারগুলোকে ক্রমবর্ধমান খরচ থেকে বাঁচাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বিশেষ সুরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করছে।
তেলের উচ্চমূল্যের কারণে আগে থেকেই ধুঁকতে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই বিদ্যুৎ মূল্য বৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এমন এক সংকটের মুহূর্তে উত্তর আলবেনিয়ার পাহাড় থেকে নেমে আসা ড্রিন নদী (Drin River) দেশটির জন্য এক শক্তিশালী 'ঢাল' হিসেবে কাজ করছে।
শীতের বৃষ্টি আর বরফ গলা পানিতে টইটম্বুর এই নদীতে কমিউনিজ আমলের বেশ কিছু জলবিদ্যুৎ বাঁধ রয়েছে। এই বাঁধগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আলবেনিয়ার মোট চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ করে। ফলে বৈশ্বিক সংকটেও দেশটিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইউরোপজুড়ে বিদ্যুৎ মূল্যের তুলনামূলক চিত্র থেকে দেখা যায়, যে দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এগিয়ে আছে, তারা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিদ্যুতের দামের তীব্র উল্লম্ফন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী মাসগুলোতে যখন দামের এই প্রভাব সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে, তখন এই দেশগুলোর পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অন্যদের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকবে।
এই পরিস্থিতি ইউরোপের সবুজ জ্বালানি রূপান্তর (Green Energy Transition)-কে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। এতদিন এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ধীরগতির জন্য সমালোচনা ছিল এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের পক্ষ থেকেও এটি বাধার মুখে পড়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংকট প্রমাণ করছে যে, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে নবায়নযোগ্য উৎস অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
গ্যাসের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল দেশগুলো বিদ্যুতের চড়া দামের কারণে মুদ্রাস্ফীতির চাপে পড়ছে। এটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের স্মৃতি এখনো ইউরোপীয়দের মনে টাটকা, আর বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরোনো উদ্বেগকেই আবার ফিরিয়ে এনেছে।
এনার্জি রিসার্চ ফার্ম 'রাইস্ট্যাড'-এর বিশ্লেষক সত্যম সিং বলেন, ‘এই সংকট পুরো অঞ্চলের দামের ভিত্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে যাদের বিকল্প ব্যবস্থা কম এবং যারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারাই সবচেয়ে বেশি বাজার অস্থিরতা ও চড়া দামের শিকার হচ্ছে।
আলবেনিয়ার ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে আড্রিয়াটিক সাগরের ওপারে ইতালিতে। ইতালি তাদের বিদ্যুতের ৪০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন করে গ্যাস থেকে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গ্যাস-নির্ভর জার্মানিতেও এই দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশের বেশি।
ফ্রান্স: দেশটি তাদের বিদ্যুতের ৭০ শতাংশ পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদন করে। সেখানে দাম বাড়লেও তা ইতালির তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
স্পেন: নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে ৬০ শতাংশে নিয়ে আসায় স্পেনে বিদ্যুতের দাম উল্টো কমেছে।
আলবেনিয়া: পর্যাপ্ত জলবিদ্যুৎ ক্ষমতার কারণে আলবেনিয়াতেও গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছর গড় দাম কম রেকর্ড করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে একটি জরুরি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে যাতে খুচরা গ্রাহক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এই উচ্চমূল্য থেকে রক্ষা করা যায়। তবে তেলের দাম ইতোমধ্যেই বেশি থাকায় শিল্পকারখানাগুলো চরম ক্ষতির মুখে রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে যেসব দেশ এখনো কয়লা বা গ্যাসে আটকে আছে, তাদের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
বিপরীতভাবে, আলবেনিয়া বা স্পেনের মতো দেশগুলোর উদাহরণ এখন ইউরোপের অন্যান্য দেশকেও বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি এবং জলবিদ্যুতের দিকে দ্রুত ধাবিত হতে উৎসাহিত করছে। এক সময়ের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন এখন মূলত জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন