রাজা চার্লস

‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বে’ আমেরিকার সঙ্গে মিত্রতা অত্যন্ত জরুরি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১১:১০ এএম
‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বে’ আমেরিকার সঙ্গে মিত্রতা অত্যন্ত জরুরি
একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটের গুরুত্ব তুলে ধরলেন রাজা, হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে।

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি যখন চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আটলান্টিকের দুই পারের দীর্ঘদিনের মিত্রতা আরও দৃঢ় করার বার্তা দিলেন ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আজকের এই ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বে‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিটেনের মিত্রতা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

হোয়াইট হাউসের গ্র্যান্ড ফয়ারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, রাজা তৃতীয় চার্লস এবং রানী কামিলা ক্যামেরার সামনে পোজ দেওয়ার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। রাজকীয় আভিজাত্য আর মার্কিন আতিথেয়তার এই মিলনমেলা দুই দেশের মধ্যকার ‘বিশেষ সম্পর্ককে( Special Relationship) এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নৈশভোজের শুরুতে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিটেনের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ককে ‘অন্যান্য যে কোনো বন্ধুত্বের চেয়ে আলাদা‘ বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়েও কথা বলেন। 

তিনি দাবি করেন যে, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সে বিষয়ে রাজা চার্লস তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। ট্রাম্প বলেন, আমাদের এই বন্ধুত্ব কেবল ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং এটি একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার।

নৈশভোজের গম্ভীর আলোচনার মাঝেও ছিল ব্রিটিশ হিউমার বা রসবোধের ছোঁয়া। রাজা চার্লস রসিকতা করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমরা (ব্রিটিশরা) না থাকলে আজ হয়তো আপনি ফরাসি ভাষায় কথা বলতেন।তাঁর এই মন্তব্যে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে। মূলত আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্রিটিশদের প্রভাব এবং পরবর্তী ইতিহাসকে ইঙ্গিত করেই এই কৌতুক করেন তিনি।

উপহার হিসেবে রাজা চার্লস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত একটি ঐতিহাসিক ঘণ্টা প্রদান করেন। এটি ছিল 'এইচএমএস ট্রাম্প' নামক একটি সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজের ঘণ্টা। নিজের নামের সাথে মিল থাকায় এই উপহারটি পেয়ে ট্রাম্প বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

নৈশভোজের আগে রাজা চার্লস মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বর্তমান বিশ্বের বিভক্তি নিয়ে কথা বলেন। রাজা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বর্তমান যুগে অনেক দেশই "অন্তর্মুখী" (Inward-looking) হয়ে পড়ছে, যা বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। 

তিনি প্রার্থনা করেন যেন ব্রিটেন এবং আমেরিকার এই জোট কখনোই বিচ্ছিন্ন না হয় এবং সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করে।

তার এই বক্তৃতার সময় মার্কিন আইনপ্রণেতারা বারবার দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন (Standing Ovation) জানান। ব্রিটিশ ইতিহাস এবং কৌতুকের সংমিশ্রণে দেওয়া এই ভাষণটি ছিল একই সাথে দূরদর্শী এবং আবেগময়।

বক্তৃতার একেবারে শেষ পর্যায়ে রাজা চার্লস একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার বলা প্রতিটি কথা বা শব্দের একটি আলাদা ওজন এবং অর্থ রয়েছে। উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা অ্যান্থনি জুরকারের মতে, রাজার এই মন্তব্যের পর উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ কেউ একে আমেরিকার নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখে একমত পোষণ করেন, আবার কেউ কেউ বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমেরিকার প্রভাব নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে ফিসফিস করতে শুরু করেন।

এই হাই-প্রোফাইল নৈশভোজে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। আটলান্টিকের উভয় তীরের এই মিলনমেলায় খাবারের মেনুও ছিল রাজকীয়। মার্কিন ও ব্রিটিশ স্বাদের সংমিশ্রণে তৈরি এই মেনু সবার নজর কেড়েছে।

নৈশভোজের মেনুতে যা ছিল:
১. স্টার্টার: হালকা ফ্লেভারের সি-ফুড এবং মৌসুমি সালাদ।
২. মূল খাবার: আমেরিকান বিফ স্টেক এবং ব্রিটিশ স্টাইলে রান্না করা সবজি।
৩. ডেজার্ট: দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি এবং ফল।

রাজা চার্লসের এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে বিশ্ব রাজনীতি উত্তপ্ত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে রাজার এই সুসম্পর্ক ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশেষ করে ট্রাম্প যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন, তখন ব্রিটিশ রাজার প্রচ্ছন্ন সমর্থন হোয়াইট হাউসের নীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

তবে রাজার বক্তৃতায় "অন্তর্মুখী" হওয়ার যে হুঁশিয়ারি ছিল, তা বর্তমানের অনেক জনতাবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি সূক্ষ্ম বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজার এই অবস্থান ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলবে।

সব মিলিয়ে রাজা চার্লসের এই সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পুরনো বন্ধুত্বের নবায়ন। একদিকে যেমন ছিল ঐতিহাসিক উপহার এবং রসিকতা, অন্যদিকে ছিল পারমাণবিক অস্ত্র এবং বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতাবাদের মতো গুরুতর বিষয়ে ঐক্যমত্যের প্রচেষ্টা। ট্রাম্প এবং চার্লসের এই রসায়ন আগামী দিনে লন্ডন-ওয়াশিংটন সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবে।

আমেরিকার ‘শব্দের ওজন’ নিয়ে রাজা যে মন্তব্য করেছেন, তা বিশ্ব দরবারে আমেরিকার দায়িত্বশীলতাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই ঐতিহাসিক মিত্রতা আগামী দিনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হয়।

এএন