একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ হলো কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান। এটি কেবল ভূরিভোজ নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। এই আয়োজনের প্রতিটি সেকেন্ড পূর্বনির্ধারিত থাকে এবং এর পেছনের প্রস্তুতি শুরু হয় কয়েক মাস আগে থেকে।
হোয়াইট হাউজের সামাজিক কার্যালয় (Social Office) এবং প্রোটোকল কর্মকর্তারা এই আয়োজনের মূল দায়িত্বে থাকেন। অতিথির তালিকা থেকে শুরু করে টেবিলের সাজসজ্জা, ফুল এবং মিউজিক, সবকিছুই অত্যন্ত যত্ন সহকারে নির্বাচন করা হয়। হোয়াইট হাউজের ডাইনিং হল বা বড় কোনো তাবু (যদি অতিথি সংখ্যা বেশি হয়) সাজানো হয় এমনভাবে যা অতিথি রাষ্ট্রের সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাবেক হোয়াইট হাউজ শেফ জন মোয়েলারের তথ্য অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ সাধারণত চারটি ধাপে বা কোর্সে পরিবেশন করা হয়। এই পর্যায়গুলো হলো:
সামুদ্রিক খাবার: প্রথম কোর্সে সাধারণত হালকা কিন্তু অভিজাত কোনো সামুদ্রিক মাছ বা আইটেম পরিবেশন করা হয়।
মাংস: এটি নৈশভোজের প্রধান আকর্ষণ। সাধারণত প্রিমিয়াম বিফ বা ল্যাম্ব স্টেক এখানে পরিবেশন করা হয়।
সালাদ: প্রধান খাবারের পর সতেজতা আনতে বিভিন্ন ধরনের সিজনাল সালাদ পরিবেশন করা হয়।
মিষ্টি বা ডেজার্ট: শেষ পাতে থাকে আকর্ষণীয় সব ডেজার্ট, যা প্রায়শই শিল্পকর্মের মতো সাজানো হয়।
হোয়াইট হাউজের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পানীয় বা ওয়াইন নির্বাচন। মোয়েলার জানান, রাষ্ট্রীয় ভোজে অতিথির দেশের ঐতিহ্যবাহী ওয়াইন বা সেই দেশের বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের তৈরি ওয়াইন পরিবেশন করা হয়। এটি মূলত সেই অভিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি একটি সম্মান প্রদর্শন, যারা আমেরিকায় বসে তাদের দেশের সংস্কৃতি ও পণ্যকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।
খাবার পরিবেশনের আগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা হলো 'টোস্ট'। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধান উভয়েই সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তারা একে অপরের দেশের সাফল্য এবং বন্ধুত্বের দীর্ঘায়ু কামনা করে গ্লাস উঁচিয়ে ধরেন। মজার ব্যাপার হলো, যতক্ষণ না এই টোস্ট বা ভাষণ শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিনারের মূল কার্যক্রম শুরু হয় না।
টোস্ট শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় আসল তৎপরতা। জন মোয়েলারের ভাষায়, ‘টোস্ট শেষ হওয়ার পর বড় দরজাগুলো খুলে যায় এবং একসাথে অনেক বাটলার বা পরিবেশনকারী ঘরে প্রবেশ করেন।একে তিনি 'রুম ফ্লাডিং' বা বন্যায় ঘর ভেসে যাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন।
লক্ষ্য থাকে একটাই- যত দ্রুত সম্ভব সব অতিথির সামনে গরম গরম খাবার পৌঁছে দেওয়া। কয়েকশ অতিথির ডাইনিং রুমে কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এই কাজ করার জন্য বাটলারদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারা একটি নির্দিষ্ট ছন্দে এবং গতিতে কাজ করেন যাতে কারোর জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন না হয়।
স্টেট ডিনারে আসন বিন্যাস বা 'সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট' হলো সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কে কার পাশে বসবেন, তার ওপর অনেক সময় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে। সাধারণত গোল টেবিল ব্যবহার করা হয় যাতে আলোচনা সহজতর হয়। প্রতিটি টেবিলে একজন করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা বা সেলিব্রিটি থাকেন যাতে কথোপকথন প্রাণবন্ত থাকে।
ডিনার শেষে সাধারণত কোনো প্রখ্যাত শিল্পী বা ব্যান্ড সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এটিও হতে পারে কোনো জ্যাজ কনসার্ট, ব্রডওয়ে পারফরম্যান্স বা ক্লাসিক্যাল মিউজিক। এটি অতিথিদের একটু হালকা হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
হোয়াইট হাউজের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ হলো ক্ষমতার সাথে সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশেল। পর্দার আড়ালে কয়েকশ শেফ, বাটলার এবং ফ্লোর ম্যানেজার যে পরিশ্রম করেন, তার ফলশ্রুতিতে অতিথিরা একটি নির্ভেজাল এবং রাজকীয় রাত কাটাতে পারেন। জন মোয়েলারের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এই আয়োজন কেবল খাওয়ার জন্য নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল যুদ্ধের মতো যেখানে জয়ের নাম হলো 'সফল কূটনীতি'।
যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং রাজা চার্লস গ্লাস উঁচিয়ে টোস্ট করেন, তখন তার পেছনে থাকে কয়েক হাজার ঘণ্টার পরিকল্পনা এবং নিখুঁত কোরিওগ্রাফি। এটিই হোয়াইট হাউজকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় কূটনৈতিক মঞ্চে পরিণত করেছে।
সূত্র: বিবিসি
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন