নিউ ইয়র্কের ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের হৃদয়ে যুক্তরাজ্যের, বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের জন্য একটি আলাদা জায়গা রয়েছে। ২০২৩ সালে স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনশায়ারে নিজের গলফ কোর্স পরিদর্শনে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছিলেন, নিজের ঘরে ফিরতে পেরে দারুণ লাগছে।একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে এই 'ঘর' শব্দটি মূলত তাঁর পারিবারিক ইতিহাসেরই প্রতিফলন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্রিটিশ সংযোগের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো তাঁর মা মেরি অ্যান ম্যাকলিওড। মেরি স্কটল্যান্ডের হেব্রাইডিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত ‘আইল অব লুইস’ (Isle of Lewis)-এ বেড়ে ওঠেন। ১৯৩০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কাজের সন্ধানে তিনি নিউ ইয়র্কে পাড়ি জমান এবং সেখানে গৃহকর্মী হিসেবে জীবন শুরু করেন।
ট্রাম্প তাঁর মায়ের জন্মভূমি এবং তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে সবসময়ই গর্ববোধ করেন। তিনি একাধিকবার স্কটল্যান্ডের টং (Tong) গ্রামে তাঁর মায়ের পৈতৃক নিবাস সফর করেছেন। রাজা চার্লস তাঁর ভাষণেও এই প্রসঙ্গের উল্লেখ করে বলেন, ট্রাম্পের মা-বাবা স্বর্গ থেকে নিশ্চয়ই অত্যন্ত গর্বের সাথে দেখছেন যে তাঁদের সন্তান আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যবসা এবং শখের জায়গা থেকেও ট্রাম্প স্কটল্যান্ডের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। বর্তমানে স্কটল্যান্ডে তাঁর দুটি বিশ্বমানের গলফ কোর্স রয়েছে:
টার্নবেরি: দক্ষিণ আয়ারশায়ারে অবস্থিত এই বিশ্বখ্যাত রিসোর্ট ও গলফ কোর্সটি ট্রাম্প ২০১৪ সালে কিনে নেন। এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা গলফ ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃত।
মেনি এস্টেট: অ্যাবারডিনশায়ারের এই জমিটি তিনি ২০০৬ সালে কেনেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং সাগরের বুকে বায়ুকল (Wind farm) স্থাপন নিয়ে বিতর্কের মাঝেও গত জুলাই মাসে তিনি এখানে আরও একটি ১৮-হোল বিশিষ্ট গলফ কোর্স উদ্বোধন করেন।
এই গলফ কোর্সগুলো ট্রাম্পের কাছে কেবল ব্যবসা নয়, বরং তাঁর স্কটিশ ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত থাকার একটি মাধ্যম। প্রায়ই তাঁকে স্কটিশ ব্যাগপাইপ সংগীতের মূর্ছনায় নিজের গলফ কোর্সে পায়চারি করতে দেখা যায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদকে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করেন। গত জুলাই মাসে তিনি স্কটল্যান্ড সফরকালে টার্নবেরিতে গলফ খেলার পাশাপাশি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন।
সেই বৈঠকটি ছিল বেশ নাটকীয়। একদিকে তিনি স্কটল্যান্ডের সৌন্দর্যের প্রশংসা করছিলেন, অন্যদিকে বাণিজ্য নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছিলেন। আলোচনার শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি ‘ভালো মেজাজে নে’ কারণ তিনি ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সেই শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের জন্য স্কটল্যান্ড কেবল ভ্রমণের জায়গা নয়, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক দরকষাকষির মঞ্চও বটে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পর্ক সবসময়ই সংবাদ শিরোনামে থাকে। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল এবং বর্তমানে রাজা তৃতীয় চার্লসের সাথেও তাঁর একটি বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ রসায়ন গড়ে উঠেছে। হোয়াইট হাউসের নৈশভোজে রাজার সাথে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে একমত হওয়া দুই দেশের মধ্যকার শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কেরই ইঙ্গিত দেয়।
রাজা চার্লস ট্রাম্পকে উপহার হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি সাবমেরিনের ঘণ্টা দিয়েছেন, যার নাম ছিল 'এইচএমএস ট্রাম্প'। এই উপহারটি কেবল নামের মিলের কারণে নয়, বরং ব্রিটেন ও আমেরিকার যৌথ সামরিক ইতিহাসের স্মারক হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেয় যে, তাঁর পারিবারিক শেকড় যেখানেই থাকুক, তাঁর পূর্বপুরুষদের ভূমি এবং বর্তমান কর্মভূমি দীর্ঘকাল ধরে একে অপরের পরিপূরক।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য প্রীতি কেবল একজন রাজনীতিবিদের কৌশল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে তাঁর মায়ের স্মৃতি এবং পৈতৃক মাটির টান। স্কটল্যান্ডের রুক্ষ প্রকৃতি আর আটলান্টিকের ঢেউয়ের মাঝে তিনি বারবার নিজের পরিচয় খুঁজে পান। একদিকে তিনি যেমন নিউ ইয়র্কের রিয়েল এস্টেট মোঘল, অন্যদিকে তিনি সেই স্কটিশ অভিবাসীর সন্তান যিনি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন।
রাজা চার্লস এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘনিষ্ঠতা আগামী দিনে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের‘স্পেশাল রিলেশনশিপ‘কে আরও কতদূর নিয়ে যায়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে ট্রাম্পের কাছে স্কটল্যান্ড সবসময়ই থাকবে—এক টুকরো ঘর, এক টুকরো ইতিহাস।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন