বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ওলটপালট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ওলটপালট
২২ এপ্রিল ২০২৬, ওমানের মুসান্দাম অঞ্চলের হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ ও নৌযান।

বিশ্ব তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর শক্তিশালী জোট 'ওপেক' (OPEC) থেকে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। মঙ্গলবার দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী সুহাইল মোহামেদ আল-মাজরুই এক বিবৃতিতে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানান। 

আগামী ১ মে থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মাঝে আমিরাতের এই বিদায় ওপেক এবং এর সহযোগী জোট ওপেক প্লাস (OPEC+)-এর জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউএই জ্বালানি মন্ত্রী সুহাইল আল-মাজরুই রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, এই সিদ্ধান্তটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি কৌশল এবং উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি একটি নিছক নীতিগত সিদ্ধান্ত। বর্তমান এবং ভবিষ্যতের উৎপাদন মাত্রার কথা মাথায় রেখেই আমরা ওপেকের কোটা প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বিশ্লেষকদের মতে, ওপেকের সদস্য হিসেবে আমিরাতকে একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন সীমা বা কোটা মেনে চলতে হতো। ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে আমিরাত এখন স্বাধীনভাবে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে পারবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং তাদের বাজার অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

আমিরাতের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বর্তমান ইরান যুদ্ধের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী 'হরমুজ প্রণালী' দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে ইরানের ক্রমাগত হুমকি ও আক্রমণের মুখে উপসাগরীয় দেশগুলো এই রুট দিয়ে তেল পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ওপেক প্লাসের বৈশ্বিক তেলের উৎপাদন অংশীদারিত্ব মার্চ মাসে ৪৮% থেকে কমে ৪৪%-এ দাঁড়িয়েছে। মে মাসে আমিরাত জোট ছেড়ে দিলে এই অংশীদারিত্ব আরও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।

এক সময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে নানা বিষয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ওপেকের নেতৃত্ব দেয় সৌদি আরব, কিন্তু আমিরাত দীর্ঘদিন ধরেই তাদের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কোটা শিথিল করার দাবি জানিয়ে আসছিল।

ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আমিরাত কার্যত রিয়াদের প্রভাব বলয় থেকে নিজেদের মুক্ত করার বার্তা দিল। আঞ্চলিক রাজনীতি, তেল নীতি এবং বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের লড়াইয়ে এই দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রিস্তাদ (Rystad)-এর বিশ্লেষক জর্জ লিওন মনে করেন, আমিরাত বেরিয়ে যাওয়ায় বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় সৌদি আরবের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আমিরাতের এই সিদ্ধান্তকে একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৮ সাল থেকেই ট্রাম্প ওপেকের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। তিনি একাধিকবার অভিযোগ করেছেন যে, ওপেক কৃত্রিমভাবে তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্বকে ‘লুটে খাচ্ছে।

ট্রাম্প সবসময়ই উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক সহায়তার বিনিময়ে তেলের দাম কমানোর ওপর জোর দিয়ে এসেছেন। আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত আমেরিকার জ্বালানি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে এবং মূল্য কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে আমিরাত আমেরিকার আরও ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।

আমিরাতের এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের উর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। যদিও হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার কারণে তাৎক্ষণিক বড় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন জ্বালানি মন্ত্রী মাজরুই। তবে দীর্ঘমেয়াদে যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তখন ওপেকের বাধ্যবাধকতা না থাকায় আমিরাত বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করতে পারবে।

এডিসিবি (ADCB)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মনিকা মালিক বলেন, এই পদক্ষেপটি আমিরাতের জন্য বৈশ্বিক বাজারে বড় অংশীদারিত্ব পাওয়ার পথ খুলে দিল। এটি বৈশ্বিক ভোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংবাদ।

আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত কেবল তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২০ সালের 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে আমিরাত একটি স্বাধীন ও প্রভাবশালী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমিরাত এখন আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে তাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করছে।

এদিকে, মঙ্গলবার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে উপসাগরীয় নেতারা মিলিত হয়ে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। এই প্রেক্ষাপটে ওপেকের মতো একটি অর্থনৈতিক জোট থেকে আমিরাতের বেরিয়ে আসা মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণেরই বহিঃপ্রকাশ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্তটি জ্বালানি কূটনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি যেমন ওপেকের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে দুর্বল করেছে, তেমনি বিশ্ববাজারে তেলের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

একদিকে সৌদি আরবের সাথে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব এবং অন্যদিকে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে ঘনিষ্ঠতা, সব মিলিয়ে আমিরাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের এক নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ইরান যুদ্ধের ডামাডোলে এই সিদ্ধান্তটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

এএন