লন্ডনে দুই ইহুদি ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
লন্ডনে দুই ইহুদি ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত

উত্তর লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিন এলাকায় দুই ইহুদি ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর ব্রিটেনে ইহুদি-বিদ্বেষ বা 'অ্যান্টিসেমিটিজম' মোকাবিলায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। এই হামলাকে ইতিমধ্যে একটি ‘সন্ত্রাসী ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। 

এই ঘটনার পর দেশটির প্রধান ধর্মযাজক (চিফ র‍্যাবাই) এবং সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো ইহুদি-বিদ্বেষকে একটি 'জাতীয় জরুরি অবস্থা' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

স্থানীয় সময় বুধবার উত্তর লন্ডনের ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা গোল্ডার্স গ্রিনে এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত করা তথ্যমতে, ছুরিকাঘাতের শিকার দুই ব্যক্তি হলেন ৩৪ বছর বয়সী শিলোম র‍্যান্ড এবং ৭৬ বছর বয়সী মোশে শাইন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কোনো প্ররোচনা ছাড়াই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। বর্তমানে তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। তবে দিনের আলোয় জনাকীর্ণ এলাকায় এমন হামলার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

হামলার পরপরই মেট্রোপলিটন পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে। পুলিশের বডি-ক্যামেরা এবং সিসিটিভিতে ধরা পড়া সেই দৃশ্যে দেখা যায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তি হাতে ছুরি নিয়ে পুলিশের দিকে এগিয়ে আসছেন।

ভিডিওতে পুলিশ কর্মকর্তাদের বারবার চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ছুরি ফেলে দাও!। কিন্তু আক্রমণকারী কর্ণপাত না করায় পুলিশ অফিসাররা 'টেজার' (Taser) গান ব্যবহার করে তাকে মাটিতে লুটিয়ে ফেলেন এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই হামলার ধরণ এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে এটিকে একটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গোয়েন্দারা কেবল উত্তর লন্ডনের এই আক্রমণ নিয়েই কাজ করছেন না; তারা বুধবার ভোরে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের একটি ঠিকানায় ঘটা পৃথক একটি ঘটনারও তদন্ত করছেন। পুলিশ বিশ্বাস করে, উভয় ঘটনার পেছনে একই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর (MI5) সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। তদন্তের অন্যতম প্রধান দিক হলো, এই হামলা কি বিশেষভাবে লন্ডনের ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে কি না।

ব্রিটেনের সন্ত্রাসবাদ পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধানের মতে, বর্তমানে ইহুদি-বিদ্বেষ দেশটিতে একটি ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’য় রূপ নিয়েছে। হামলার পর ব্রিটেনের প্রধান ধর্মযাজক (চিফ র‍্যাবাই) এই পরিস্থিতির গভীর সমালোচনা করে বলেছেন, কেবল নিন্দা জানানোই যথেষ্ট নয়, এখন সময় এসেছে ‘অর্থবহ পদক্ষেপ‘নেওয়ার।

ইহুদি নিরাপত্তা বিষয়ক একটি দলের (CST) এক সদস্য বিবিসির সাথে আলাপকালে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব কী হচ্ছে? আমরা আর কত সহ্য করতে পারি?

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লন্ডনে ইহুদি-বিদ্বেষী অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের তালিকায় ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্য করে চালানো হামলার সংখ্যা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে। এর ফলে গোল্ডার্স গ্রিন, স্ট্যামফোর্ড হিল এবং হেন্ডনের মতো এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে।

গোল্ডার্স গ্রিনের এই ঘটনা কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি লন্ডনের বহুত্ববাদী সমাজের জন্য একটি বড় আঘাত। উত্তর লন্ডনের এই এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে ইহুদিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এই হামলার পর সেই আস্থার জায়গায় ফাটল ধরেছে।

সরকার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এখনই সামাজিক ও রাজনৈতিক পর্যায় থেকে এই চরমপন্থা ও বিদ্বেষ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নিতে পারে।

উত্তর লন্ডনের আকাশ এখন কেবল পুলিশের হেলিকপ্টারের শব্দে নয়, বরং এক অজানা আতঙ্ক আর বিচার চাওয়ার দাবিতে ভারী হয়ে উঠেছে। শিলোম ও মোশে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন, কিন্তু ব্রিটিশ সমাজের এই ক্ষত কতদিনে শুকাবে, তা এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: বিবিসি

এএন