ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ

তেহরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব এবং ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক  প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৭:১৯ এএম
তেহরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব এবং ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থা
তেহরান, ইরানে একটি সমাবেশে মানুষ স্লোগান দিচ্ছে [ফাইল: মাজিদ আসগারিপুর/ওয়ানা, রয়টার্স-এর মাধ্যমে]

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও স্থায়ী শান্তির পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ। এই পরিস্থিতির মধ্যে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটনের কাছে একটি নতুন ‘১৪ দফা প্রস্তাব’ পেশ করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ-অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণার পর এই প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা এর মেয়াদ বাড়ানো নয়, বরং যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তি চায়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পাঠানো এই ১৪ দফা প্রস্তাবে ইরান মূলত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো দাবি করেছে:

৩০ দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা: ইরান চায় আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান করে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।
নিরাপত্তার নিশ্চয়তা: ভবিষ্যতে ইরান বা তার পরমাণু বিজ্ঞানীদের ওপর কোনো প্রকার আক্রমণ হবে না, এমন আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি দাবি করেছে তেহরান।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: ইরানের চারপাশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অঞ্চলগুলো থেকে মার্কিন সামরিক শক্তি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
জব্দকৃত সম্পদ ফেরত ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: কয়েক দশক ধরে আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানের অর্থনীতির ওপর চেপে বসা সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ: যুদ্ধের ফলে ইরানের যে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বা 'War Reparations' চেয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালীর নতুন ব্যবস্থা: হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য একটি নতুন ব্যবস্থাপনা বা কন্ট্রোল মেকানিজম তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ইরানের সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে।
পারমাণবিক অধিকার: এনপিটি (NPT) চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখতে চায়।

ইরানের এই প্রস্তাবের বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন ঠিকই, কিন্তু ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব কি না সে ব্যাপারে তিনি সন্দিহান।

ট্রাম্পের মতে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা। তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে অবশ্যই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। এছাড়া, ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, ইরান গত ৪৭ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে যে অশান্তি সৃষ্টি করেছে, তার জন্য তারা এখনো পর্যাপ্ত মূল্য দেয়নি। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তিনি আরও কঠোর ভাষায় ইরানের প্রস্তাব নাকচ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই প্রণালীতে এক প্রকার কার্যকর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ দিয়েছে।

বর্তমানে দুই দেশই একে অপরের বাণিজ্যিক জাহাজ আটক এবং জব্দ করার খেলায় মেতেছে। গত ২৪ এপ্রিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) ‘এমএসসি ফ্রান্সেস্কা’ নামক একটি জাহাজ জব্দ করে। এর জবাবে ট্রাম্প এখন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরু করতে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো আটকে পড়া জাহাজগুলোকে পাহারায় বের করে আনবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে যুদ্ধের একটি নতুন ধাপ যা সরাসরি সংঘাত উস্কে দিতে পারে।

৬৫ দিনের এই যুদ্ধ ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। আল-জাজিরার তথ্যমতে:

  • দেশজুড়ে প্রায় ২৩,০০০ বাণিজ্যিক ভবন ধ্বংস হয়েছে।
  • প্রায় ২০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন।
  • কাঁচামালের অভাব এবং নিয়মিত ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রযুক্তি এবং উৎপাদন শিল্প বন্ধের পথে।
  • লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ইরানপন্থি হিজবুল্লাহ এবং সাধারণ মানুষ চরম সংকটে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি বলেন, ইরান গত ৪৭ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। কোনো অর্থনৈতিক চাপই তাদের পুরোপুরি নতি স্বীকার করাতে পারেনি। তবে এবারের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ইরান তাদের প্রস্তাবে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দুই পক্ষ এখনো বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, সুফান সেন্টারের কেনেথ কাটজম্যানের মতে, মূল সমস্যা হলো ‘পারস্পরিক আস্থার অভাব’। ইরান ট্রাম্পকে বিশ্বাস করতে পারছে না, আর ট্রাম্প মনে করছেন ইরানকে আরও চাপে ফেললে তারা আত্মসমর্পণ করবে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, 'বল এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। তারা কূটনীতির পথ বেছে নেবে নাকি সংঘাতের পথ, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত।

একদিকে ইরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব, অন্যদিকে ট্রাম্পের রণংদেহী ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’। যদি কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে হরমুজ প্রণালীতে শুরু হওয়া এই নৌ-সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এএন