বন্যপ্রাণের হৃদস্পন্দনে পদযাত্রা এবং ওয়াকিং সাফারির বিশ্ব রাজধানী জাম্বিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬, ০৭:৪১ এএম
বন্যপ্রাণের হৃদস্পন্দনে পদযাত্রা এবং ওয়াকিং সাফারির বিশ্ব রাজধানী জাম্বিয়া

আফ্রিকার গহীন অরণ্যে বন্যপ্রাণী দেখার চিরাচরিত চিত্র হলো জিপে চড়ে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু জাম্বিয়া এই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। বর্তমানে যখন কেনিয়ার মাসাই মারা বা তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটির মতো অভয়ারণ্যগুলোতে পর্যটকদের ভিড় এবং যানবাহনের কোলাহল বাড়ছে, তখন জাম্বিয়া অফার করছে এক নিস্তব্ধ, নিবিড় এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা- 'ওয়াকিং সাফারি'। যান্ত্রিক ইঞ্জিনের শব্দহীন এই যাত্রায় আপনি কেবল প্রকৃতিকে দেখবেন না, বরং প্রকৃতির একটি অংশ হয়ে উঠবেন।

ওয়াকিং সাফারি কেবল বন্যপ্রাণী দেখা নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। একজন দক্ষ গাইডের নেতৃত্বে যখন আপনি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে চলেন, তখন আপনার ইন্দ্রিয়গুলো প্রখর হয়ে ওঠে। মোপেন বনের শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ, বাতাসের গায়ে লেগে থাকা টারপেন্টাইনের মতো ঘ্রাণ- সবই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।

গাইড থমাস মুলোঙ্গার মতে, পায়ে হেঁটে সাফারি করা মানে আপনি প্রকৃতিকে কেবল দেখছেন না, আপনি তার ভেতরে বাস করছেন।এখানে কোনো কাঁচের দেওয়াল নেই, পালানোর জন্য কোনো স্টার্ট দেওয়া ইঞ্জিন নেই। আছে কেবল মাটি আর বন্যপ্রাণীর মধ্যে কয়েক গজের দূরত্ব। এই নৈকট্যই পর্যটককে প্রাণীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।

জাম্বিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে গণ্ডার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আশির দশকে চোরাচালান এবং দুর্বল সুরক্ষার কারণে এখানকার গণ্ডার জনসংখ্যা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ১৯৮৯ সালে সাদা গণ্ডার এবং ১৯৯৮ সালে কালো গণ্ডারকে জাম্বিয়ায় বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলেছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টায় জাম্বিয়া এখন ৬০টি কালো এবং ৫৪টি সাদা গণ্ডারের আবাসস্থল। মসি-ও-তুনিয়া ন্যাশনাল পার্কে 'লুই ২' (Louis II)-এর মতো বিশালাকার গণ্ডারদের এখন অবাধে বিচরণ করতে দেখা যায়। ওয়াকিং সাফারির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি এই চোরাশিকার বিরোধী অভিযান এবং সংরক্ষণ প্রকল্পে ব্যয় করা হয়।

১৯৫০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ নরম্যান কার জাম্বিয়ায় আধুনিক ওয়াকিং সাফারির সূচনা করেন। সেই যুগে সাফারি মানেই ছিল শিকার বা ট্রফি হান্টিং। নরম্যান কার বিশ্বাস করতেন, একটি বন্যপ্রাণী মৃত অবস্থার চেয়ে জীবিত অবস্থায় অনেক বেশি মূল্যবান। তাঁর এই পরিবেশবান্ধব চিন্তাধারা জাম্বিয়ার পর্যটনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। আজ জাম্বিয়ার গাইডিং সংস্কৃতি বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃত। একজন গাইডকে সাফারির লাইসেন্স পেতে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ এবং কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

পায়ে হেঁটে চলা মানেই বিপদের আশঙ্কা থাকে, তবে জাম্বিয়ার সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুনিপুণ। প্রতিটি দলের সাথে একজন অভিজ্ঞ গাইডের পাশাপাশি দুজন সশস্ত্র বন্যপ্রাণী স্কাউট থাকেন। তাদের কাঁধের রাইফেলগুলো পর্যটকদের রক্ষা করার জন্য যতটা না ব্যবহৃত হয়, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় চোরাশিকারিদের হাত থেকে বনকে রক্ষা করতে।

হিপো, কেপ বাফেলো বা হাতি- পায়ে হেঁটে এদের সামনে পড়লে মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে গাইডের নির্দেশ মেনে একক সারিতে (Single File) নিঃশব্দে চললে এবং বন্যপ্রাণীর আচরণ বুঝতে পারলে এই যাত্রা অত্যন্ত নিরাপদ ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

ওয়াকিং সাফারির জন্য জাম্বিয়ার বেশ কিছু পার্ক বিশ্বখ্যাত:

সাউথ লুয়াঙ্গুয়া (South Luangwa): এটি ওয়াকিং সাফারির জন্মস্থান এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় কেন্দ্র। বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি এবং লেপার্ড দেখার জন্য এটি বিখ্যাত।
লোয়ার জাম্বেজি এবং কাফুয়ে (Lower Zambezi & Kafue): যারা ভিড় এড়িয়ে আরও বুনো পরিবেশে থাকতে চান, তাদের জন্য এই পার্কগুলো আদর্শ।
মসি-ও-তুনিয়া (Mosi-oa-Tunya): ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের কাছে অবস্থিত এই পার্কে গণ্ডার দেখা যায়, তবে এখানে বড় শিকারি বিড়াল (সিংহ বা চিতা) নেই।

বর্তমানে আফ্রিকার মাত্র ২-৩ শতাংশ পর্যটক ওয়াকিং সাফারি বেছে নেন। তবে জাম্বিয়া ইচ্ছাকৃতভাবেই গণ-পর্যটন (Mass Tourism) এড়িয়ে চলতে চায়। তাদের লক্ষ্য হলো- উচ্চ মানের অভিজ্ঞতা এবং নিম্ন পরিবেশগত প্রভাব। 

গ্যারেথ জোনসের মতো পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই 'স্লো ট্যুরিজম' বা ধীরগতির পর্যটনই অরণ্যের ভবিষ্যৎ। এটি কেবল বড় প্রাণীদের ওপর ফোকাস করে না, বরং মাটির নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পিঁপড়ে, ছোট টিকটিকি বা গোবরে পোকার কর্মতৎপরতাকেও গুরুত্ব দেয়।কেন জাম্বিয়া অনন্য?

২০২৬ সালের পর্যটন ট্রেন্ডগুলো বলছে, মানুষ এখন কেবল ছবি তুলতে নয়, প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করতে ভ্রমণ করছে। জাম্বিয়া ঠিক সেই সংযোগটিই প্রদান করে। সেখানে পর্যটকদের পা কেবল মাটির ওপর পড়ে না, বরং বন্যপ্রাণের পদচিহ্নের ওপর দিয়ে চলে।

যখন আপনি বিকেলে মোপেন বনের ভেতর দিয়ে হাঁটবেন এবং লুই ২-এর মতো কোনো গণ্ডারকে শান্তভাবে লতাপাতা খেতে দেখবেন, তখন বুঝবেন যে এটি কেবল একটি ভ্রমণ নয়- এটি একটি দায়িত্ব। প্রকৃতির ঘ্রাণ, পতঙ্গের ঝিঁঝিঁ শব্দ এবং বুনো হাওয়া আপনার স্মৃতিতে আলোকচিত্রের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে। 

জাম্বিয়া প্রমাণ করেছে যে, দ্রুতগতিতে বদলে যাওয়া এই বিশ্বে কখনো কখনো একটু ধীরে চলাই হলো সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

এএন