ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলন ২০২৬

আড়ম্বরপূর্ণ আতিথেয়তা আর অমীমাংসিত সমীকরণের এক নতুন অধ্যায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
আড়ম্বরপূর্ণ আতিথেয়তা আর অমীমাংসিত সমীকরণের এক নতুন অধ্যায়

চীন, বিশ্ব রাজনীতির দুই মেরুর দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বহুপ্রতীক্ষিত দুই দিনের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন শেষ হয়েছে।

একদিকে লাল গালিচা সংবর্ধনা, রাজকীয় ভোজ এবং বন্ধুত্বের উষ্ণ বার্তার প্রদর্শন, অন্যদিকে কোনো সুনির্দিষ্ট বড় চুক্তি বা বাণিজ্যিক ব্রেকথ্রু ছাড়াই ট্রাম্পের বেজিং ত্যাগ এই দ্বিমুখী বাস্তবতাই এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যদিও ট্রাম্প এই সফরকে ‘অত্যন্ত সফল’ এবং অপূর্ব বাণিজ্যিক চুক্তির সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু বাস্তব তথ্য ও উপাত্তের অভাব এই দাবিকে কিছুটা ধূম্রজালে আটকে রেখেছে।

ট্রাম্পের এই সফর ছিল আক্ষরিক অর্থেই প্রতীকীবাদে ঠাসা। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের একান্ত সান্নিধ্য এবং সেই দুর্ভেদ্য কমপাউন্ডে আমন্ত্রণ, যেখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই, ট্রাম্পের জন্য বিশেষ সম্মানের নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। শি জিনপিং এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করেছেন। 

ট্রাম্পও মুগ্ধতা লুকিয়ে রাখেননি, তিনি আগামী সেপ্টেম্বরে শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে আসার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তবে এই ঝকঝকে হাসির আড়ালে দুই দেশের মধ্যকার জটিল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত কি নিরসন হয়েছে, এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

বাণিজ্য ছিল এই সম্মেলনের মূল স্তম্ভ। ট্রাম্পের সাথে ছিল এক বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল, যার মধ্যে টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংয়ের মতো হাই-প্রোফাইল সিইওরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

বোয়িং চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে প্রথম বড় মার্কিন বাণিজ্যিক বিমান ক্রয়। তবে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই সংখ্যার কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংখ্যাটি ট্রাম্পের দাবির চেয়ে অনেক কম হতে পারে।

কৃষি ও বিনিয়োগের বিষয়ে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চীন আমেরিকার ব্যবসায়ীদের সাথে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে মার্কিন সয়াবিন, গরুর মাংস এবং পোল্ট্রি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়ে আশ্বাস মিলেছে বলে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন।

কোনো সুনির্দিষ্ট ট্যারিফ চুক্তি না হলেও, দুই দেশ একটি স্থায়ী 'বোর্ড অফ ট্রেড' বা বাণিজ্য বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি মূলত শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা এবং পারস্পরিক বাণিজ্যিক বিবাদ নিরসনে একটি মধ্যস্থতাকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন ‘পারস্পরিক জয়’ বা উইন-উইন এবং স্থিতিশীলতার কথা বললেও বড় কোনো ক্রয়ের খবর সরাসরি স্বীকার করেননি।

এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ইলন মাস্ক এবং জেনসেন হুয়াংয়ের নেমে আসা। বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর চিপ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি নিয়ে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তাতে এই দুই ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি অত্যন্ত অর্থবহ।

টেসলা কোম্পানির এখানে মূল স্বার্থের জায়গা ছিল সাংহাই গিগাফ্যাক্টরি এবং চীনা বাজার, তবে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা। অন্যদিকে এনভিডিয়ার মূল স্বার্থ ছিল উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ বিক্রির সুযোগ, যেখানে তাদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন।

বিশেষ করে এনভিডিয়ার প্রধানের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত এআই এবং চিপ বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়ার কথা ভাবছে, যা আগে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। যদিও গ্রিয়ার দাবি করেছেন যে চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়নি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন বন্ধ দরজার পেছনে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যে শুল্ক বিরতি বা ট্যারিফ ট্রুস কার্যকর হয়েছিল, তার মেয়াদ আগামী নভেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ব্লুমবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিরতি আরও বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ, যদি সেপ্টেম্বরের হোয়াইট হাউস বৈঠকে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে দুই দেশ আবারও একটি বড় আকারের বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রথাগত বাণিজ্যিক আলোচনার বাইরে চীন এবার অত্যন্ত কঠোরভাবে তাইওয়ান ইস্যুটিকে সামনে এনেছে। শি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-মার্কিন সম্পর্কের জন্য ‘সবচেয়ে সংবেদনশীল’ বিষয়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই বিষয়টি ভুলভাবে পরিচালনা করলে দুই দেশ সরাসরি সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। বাণিজ্যকে তাইওয়ানের সাথে যুক্ত করার এই নতুন চীনা কৌশল মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর অবরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ট্রাম্পের আশা ছিল, চীন তার প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে শান্ত করবে যাতে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। এই বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল এমন যে, শি জিনপিং তাকে বলেছেন তিনি হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত দেখতে চান এবং যেকোনোভাবে সাহায্য করতে রাজি।

তবে চীনের অবস্থান অন্যরকম, চীন যুদ্ধবিরতির ডাক দিলেও কোনো সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। চীনের economy বা অর্থনীতিও তেলের দাম বাড়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তবে তারা মার্কিন এজেন্ডায় সরাসরি সায় দিতে নারাজ।

 

এই সফরটি নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণার চেয়ে উষ্ণ বক্তব্য ও প্রতীকী গুরুত্ব দিয়েই বেশি চিহ্নিত ছিল। ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্প-শি সম্মেলন ২০২৬-এর ফলাফলকে এক কথায় বর্ণনা করা কঠিন। এটি কি কেবল একটি ‘ফটো-অপ’ বা ছবি তোলার সুযোগ ছিল, নাকি পর্দার আড়ালে বড় কোনো পরিবর্তনের বীজ বপন করা হয়েছে?

এই সম্মেলনের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে সরাসরি যুদ্ধের হুমকি থেকে সরে এসে আলোচনার টেবিলে বসা, ‘বোর্ড অফ ট্রেড’ গঠন যা নিয়মিত যোগাযোগের পথ খুলে দেবে এবং কৃষিখাতে কিছু রপ্তানি বৃদ্ধির ইঙ্গিত। অন্যদিকে এর নেতিবাচক বা অমীমাংসিত দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে শুল্ক বিরতি বাড়ানোর কোনো গ্যারান্টি না থাকা, এআই এবং চিপ বিক্রির বিষয়ে আইনি জটিলতা রয়ে যাওয়া এবং তাইওয়ান ও ইরান ইস্যুতে অবস্থানের কোনো পরিবর্তন না হওয়া।

আসলে আগামী সেপ্টেম্বরের হোয়াইট হাউস সফরই হবে আসল অগ্নিপরীক্ষা। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, ট্রাম্প এবং শি উভয়েই সময় নিচ্ছেন। ট্রাম্প চাইছেন আমেরিকার অর্থনীতিকে চাঙা করতে বড় কিছু ‘ডিল’ বা চুক্তি দেখাতে, আর শি চাইছেন মার্কিন প্রযুক্তি অবরোধ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে চীনের শিল্পায়ন বজায় রাখতে।

আপাতত দুই পক্ষই ‘জেতা-জেতা’ বা উইন-উইন বুলি আওড়ালেও, প্রকৃত বিজয়ী কে হবে তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের পর্দার ওপারের কূটনৈতিক লড়াইয়ের ওপর। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির এই টানাপোড়েন যে কেবল তাদের নয়, বরং পুরো পৃথিবীর শেয়ার বাজার, তেলের দাম এবং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করবে, তা এই সম্মেলন থেকে আবারও পরিষ্কার হয়ে গেল।

জেএইচআর