মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ আলোচনার পর আগামী রবিবার শেষ হতে যাওয়া লেবানন, ইসরায়েল নামমাত্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে লেবানন। তবে এই কূটনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ও গ্রামগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর বিমান ও স্থল হামলা অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবারের পৃথক হামলায় তিন প্যারামেডিক বা জরুরি স্বাস্থ্যকর্মীসহ অন্তত ১২ জন লেবাননি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
অন্য দিকে, এই আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেই এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক মোড় সামনে এসেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে নতুন করে আলোচনায় বসতে আগ্রহ প্রকাশ করে ওয়াশিংটনের ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের সাথে যোগাযোগ করেছে। তবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনও তীব্র অচলবস্থা বজায় রয়েছে।
আমেরিকার মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান আংশিক বা নামমাত্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী রবিবার শেষ হওয়ার কথা ছিল। লেবানন সরকার এই মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়াতে সম্মত হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। বৈরুতের আশা ছিল, এর মাধ্যমে হয়তো সীমান্তে রক্তপাত কিছুটা কমবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধবিরতির এই চুক্তি বা ঘোষণা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে লেবাননের মাটিতে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি বেসামরিক লোকালয়, শহর ও গ্রামে উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে ৩ জন প্রথম সারির প্যারামেডিক বা জরুরি স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন, যারা যুদ্ধকবলিত এলাকায় আহতদের উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হচ্ছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল। এর ফলে দক্ষিণ লেবাননের উদ্ধার তৎপরতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
লেবানন ও গাজায় চলমান এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করে চলেছে, ঠিক তখনই মস্কোয় অনুষ্ঠিত ব্রিকস অর্থাৎ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা রাষ্ট্রজোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
আরাগচি ব্রিকস নেতাদের জানান, তেহরান সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে একটি বিশেষ বার্তা বা কূটনৈতিক যোগাযোগ পেয়েছে। ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রদের অর্থাৎ হিজবুল্লাহ ও হামাসের সাথে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক উত্তেজনা নিরসনে ইরানের সাথে নতুন করে আলোচনায় বসতে উন্মুক্ত ও প্রস্তুত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই দাবি করে আসছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করবেন। ইরানের সাথে এই নতুন যোগাযোগকে ট্রাম্পের সেই চুক্তিভিত্তিক কূটনীতির অংশ হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মার্কিন প্রশাসন আলোচনার টেবিলে বসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার মূল বিরোধের জায়গাটিতে এখনো কোনো বরফ গলেনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান নিয়ে গভীর অচলবস্থা বহাল রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তারা যুদ্ধের অবসান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য যেকোনো যৌক্তিক সংলাপের জন্য প্রস্তুত। তবে তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার এবং সমৃদ্ধকৃত উপাদানের প্রশ্নে ইরান কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। এই বিষয়ে ওয়াশিংটনের সাথে তাদের মতবিরোধ এখনো কাটেনি।
আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দাবি, ইরান অতি-উচ্চ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি। অন্য দিকে, ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং চিকিৎসা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে পরিচালিত। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তাদের পরমাণু কর্মসূচিতে কঠোর লাগাম টানতে চায়, যা মেনে নিতে তেহরান এখনো অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
ব্রিকস বৈঠকে ইরানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমা ব্লকের বাইরে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে উঠছে। ইরান, রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর এই জোটে ইরান এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ব্রিকস মঞ্চকে ব্যবহার করে বিশ্বকে দেখাতে চায়, তারা আন্তর্জাতিকভাবে একা নয়। আমেরিকার সাথে আলোচনা করলেও তারা নিজেদের শর্তেই তা করবে। রাশিয়া এবং চীনও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক আধিপত্য কমানোর জন্য ইরান ও লেবাননের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছে।
দক্ষিণ লেবানন থেকে ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে বৈরুত ও দেশের অন্যান্য নিরাপদ অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছেন। ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির যে চুক্তি হয়েছে, তা লেবাননবাসীর মনে কিছুটা আশার আলো দেখালেও, মাটিতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইসরায়েলের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এই অঞ্চলের সমীকরণ কোন দিকে নিয়ে যায়, তা যেমন দেখার বিষয়, ঠিক তেমনই ট্রাম্পের এই আলোচনার প্রস্তাব ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কীভাবে গ্রহণ করেন, তা-ই এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন