পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র কাছে ক্ষমতা হারিয়েছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। আর ক্ষমতাচ্যুতির মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় ঘাসফুল শিবিরে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন অন্তর্দ্বন্দ ও ভাঙন। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দল ধরে রাখতে কার্যত হিমশিম খাচ্ছে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
এই পরিস্থিতির মাঝেই এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে ,দলের সদ্য বহিষ্কৃত দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহার সঙ্গে তৃণমূলের অন্তত ৫০ জন বিধায়ক সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। এর ফলে রাজ্য রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মাইনাস করে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বা ফ্রন্ট তৈরির গুঞ্জন তীব্র হয়েছে।
স্বাক্ষর জালিয়াতির কেলেঙ্কারি
দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত সোমবার তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয় রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ তথা বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কলকাতার এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে। তবে এই বহিষ্কারের নেপথ্যে রয়েছে এক চাঞ্চল্যকর 'স্বাক্ষর জালিয়াতি'র ঘটনা।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে তৃণমূলের প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে দলের পক্ষ থেকে একটি চিঠি জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী একটি বিস্ফোরক সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন যে, ঋতব্রত এবং সন্দীপন অভিযোগ করেছেন—উক্ত চিঠিতে তাঁদের অজান্তেই তাঁদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে বিধানসভা সচিবালয় স্থানীয় থানায় একটি এফআইআর দায়ের করে, যার তদন্তভার বর্তমানে রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি -র হাতে ন্যস্ত রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর এই সাংবাদিক বৈঠকের পর আর সময় নষ্ট করেনি তৃণমূল নেতৃত্ব। তড়িঘড়ি দলবিরোধী কাজের অভিযোগে দুজনকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
'মাইনাস মমতা-অভিষেক' ফর্মুলা?
দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করার পরই তৃণমূলের ভেতরের ফাটলটি জনসমক্ষে পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। সূত্রের খবর, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই কলকাতার ইএম বাইপাস , সংলগ্ন একটি বিলাসবহুল হোটেলে তৃণমূলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকটি সাধারণ কোনো অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ নয়। দলের অভ্যন্তরে একটি বড়সড় অংশ এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব একটি গোষ্ঠী বা উপদল তৈরি করতে চাইছে। এই ৫০ জন বিধায়ক যদি সত্যিই দলত্যাগ করেন বা বিধানসভায় পৃথক অবস্থান নেন, তবে তা রাজ্যে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিতকে একবারে ধসিয়ে দেবে।
কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়? বহিষ্কারের পুরনো ইতিহাস
৪৬ বছর বয়সী রাজনীতিক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া এটিই প্রথম নয়। একসময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি অফ মার্কসিস্ট (সিপিএম)-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআই -এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্নেহভাজন নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।
২০১৪ সালে সিপিএমের টিকিটে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে রাজ্যসভার সাংসদ মনোনীত হন। ২০১৭ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিলাসিতা এবং দলের লাইনের বাইরে গিয়ে কাজ করার অভিযোগে সিপিএম তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে। ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় স্বতন্ত্র বা নির্দল সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আরজি কর বিতর্ক ও তৃণমূলে প্রবেশে কলকাতার আরজি কর হাসপাতাল, কাণ্ডের জেরে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ জহর সরকার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন। সেই শূন্য আসনে তৃণমূলের টিকিটে পুনরায় রাজ্যসভায় যান ঋতব্রত।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে রাজ্যসভার সংসদীয় রাজনীতি থেকে সরাসরি নির্বাচনী ময়দানে নামিয়ে বিধানসভার টিকিট দেন। এছাড়া তিনি তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি -এর রাজ্য সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষোভ
ঋতব্রতর এই বিদ্রোহের পর সোমবার এক জনসভায় তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঋতব্রতর বামপন্থী অতীত স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বামফ্রন্ট থেকে আসা এক নীতিহীন ব্যক্তিকে আমরা দলে জায়গা দিয়েছিলাম। সে আমাদের কাছে কার্যত ভিক্ষা চেয়ে বিধানসভার টিকিট নিয়েছিল, তাকে টিকিট দেওয়াটাই আমাদের মস্ত বড় ভুল ছিল। সিপিএম সেসময় তাকে দল থেকে বের করে একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আর আমরাই তাকে আশ্রয় দিয়ে ভুল করেছি। এই লোকগুলো প্রতিদিন গোপনে বিজেপির সঙ্গে বৈঠক করছে এবং দিল্লির নির্দেশ মতো কাজ করে দল ভাঙার চক্রান্ত করছে।
কাউকে নাম না করে তৃণমূল নেত্রী আরও ইঙ্গিত দেন যে, এই চক্রান্তের পেছনে দলের এক বর্তমান সাংসদও জড়িত আছেন, যিনি তাঁর নিজের ছেলের জন্য বিধানসভার টিকিট দাবি করেছিলেন এবং না পেয়ে এখন পেছন থেকে কাঠি করছেন।
কলকাতার রাজনীতিতে উদীয়মান বিদ্রোহী
ঋতব্রতর সঙ্গে বহিষ্কৃত হওয়া অপর নেতা সন্দীপন সাহা হলেন কলকাতার রাজনীতির চেনা মুখ। তিনি তৃণমূলের প্রবীণ নেত্রী তথা প্রাক্তন বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহার পুত্র।
রাজনীতিতে আসার পর সন্দীপন কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দল তাঁকে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী 'এন্টালি' আসন থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে এবং তিনি জয়লাভ করেন। মায়ের রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নিজের তারুণ্যের কারণে কলকাতার দলীয় কর্মীদের একাংশের ওপর তাঁর ভালো প্রভাব রয়েছে, যা এখন তৃণমূলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আগামী দিনের প্রভাব
নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই এই 'স্বাক্ষর কেলেঙ্কারি' এবং বিধায়কদের বিদ্রোহ তৃণমূলের জন্য এক বিরাট বিপর্যয়। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যেভাবে তৃণমূলের ভেতরের খবর এনে হাটে হাঁড়ি ভাঙছেন, তাতে স্পষ্ট যে দলটির একটি বড় অংশ এখন বিজেপির সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ রাখছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে যদি সত্যিই ৫০ জন বিধায়ক দল ত্যাগ করেন, তবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় তৃণমূলের শক্তি যেমন নজিরবিহীনভাবে হ্রাস পাবে, তেমনই আগামী দিনে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের টিকিয়ে রাখার লড়াইটাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। দলত্যাগী এই বিধায়কদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে- তাঁরা বিজেপিতে যোগ দেবেন নাকি নতুন কোনো আঞ্চলিক দল গঠন করবেন- তা দেখতেই এখন চোখ রাখছে গোটা রাজ্য।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন