‘আমি মূল্যস্ফীতি ভালোবাসি’ ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে মার্কিন রাজনীতিতে তোলপাড়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
‘আমি মূল্যস্ফীতি ভালোবাসি’ ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে মার্কিন রাজনীতিতে তোলপাড়

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি যখন ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিস্ফোরক মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে মার্কিন মুলুকে মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে আমি মুদ্রাস্ফীতি ভালোবাসি, এমন বক্তব্য শুনবেন, তা হয়তো হোয়াইট হাউসের পোড়খাওয়া সাংবাদিকরাও আশা করেননি। ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই মার্কিন রাজনৈতিক মহলে যেন বোমাবর্ষণ হয়েছে, যার ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে।

বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক নাটকীয়তার খবরটি বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসে।

মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) পক্ষ থেকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মে মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) বা কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্সের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি এই নথিতে দেখা গেছে, মে মাসে দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার এক বছর আগের তুলনায় লাফিয়ে ৪.২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এর ঠিক আগের মাস অর্থাৎ এপ্রিলে এই সূচকটি ছিল ৩.৮ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গত তিন বছরের মধ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির রেকর্ড। মূলত মে মাসের এই উল্লম্ফন সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের পকেট ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

মূল্যস্ফীতির এই অস্বস্তিকর তথ্য প্রকাশের পরপরই হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে অপ্রত্যাশিতভাবে মন্তব্য করেন, আসলে মে মাসের সংখ্যাগুলো অসাধারণ ছিল। আমি মুদ্রাস্ফীতি ভালোবাসি।

প্রেসিডেন্টের এই এক লাইনের বক্তব্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্প প্রশাসন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন, তার এই সংবেদনশীল মন্তব্যটিকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে ও ভিন্ন উদ্দেশ্যে গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি আসলে বিষয়টিকে ইতিবাচক অর্থে বোঝাতে চেয়েছিলেন। তার মতে, বর্তমানে ইরানের সঙ্গে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি যতটা আকাশচুম্বী হওয়ার কথা ছিল, পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ইরানের সাথে এই সংকট দ্রুত শেষ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমে আসবে, যার সুবাদে মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারেও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এছাড়া মার্কিন সামরিক কৌশল ও বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ইতোমধ্যে তেলের বাজারে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করলেও বাস্তব ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল সূচক 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর মূল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উঁচুতে অবস্থান করছে।

এর ওপর যোগ হয়েছে ইরানের রণকৌশলগত অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট 'হরমুজ প্রণালি'-তে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের যে চেইন রয়েছে, তা ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে, যা প্রকারান্তরে আমেরিকার বাজারেও তেলের আগুন জ্বালিয়ে রাখছে।

আমেরিকায় এটি নিয়ে টানা তৃতীয় মাসের মতো মূল্যস্ফীতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী রইল। মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল জ্বালানি তেল কিংবা গ্যাসোলিনের দামই বাড়েনি, বরং এর প্রভাবে মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার অন্যান্য অনুসঙ্গও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

অবশ্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমানের ৪.২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের সেই রেকর্ড ৯.১ শতাংশের চেয়ে অনেকটাই কম। 

তবে সমস্যা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে মূলত এই অর্থনৈতিক দূরবস্থা এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। ফলে এখন তার প্রশাসনের আমলেই টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি বাড়ায় তা ট্রাম্পের জন্য তীব্র রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।

চলতি পরিস্থিতিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদের হার বাড়াবে কিনা, তা নিয়ে দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

শুধু মে মাসের এই একটি তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সুদের হার বাড়ানোর মতো কোনো শক্তিশালী বা চূড়ান্ত সংকেত দেওয়া যায় না। বাজার পরিস্থিতি আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান 'ওয়েলথ ক্লাব'-এর অন্যতম প্রধান ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার আইজ্যাক স্টেল সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের চমৎকার কর্মসংস্থান তথ্য এবং মে মাসের এই অব্যাহত মূল্যস্ফীতির প্রবণতাকে যদি একসাথে বিবেচনা করা হয়, তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার বৃদ্ধি করাই হবে ফেডারেল রিজার্ভের জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই 'মূল্যস্ফীতি প্রীতি,মন্তব্যকে লুফে নিতে হাতছাড়া করেনি বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রভাবশালী নেতা চাক শুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এ দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি ট্রাম্পের যে চরম অবজ্ঞা রয়েছে, এই মন্তব্য তারই প্রমাণ। সাধারণ মানুষের প্রতি তার অবজ্ঞার আসলে কোনো সীমা নেই।

সামনে আমেরিকার অন্তর্বর্তীকালীন ও স্থানীয় নির্বাচনগুলো ঘনিয়ে আসায়, ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে ডেমোক্র্যাটরা তাদের রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ যেখানে প্রতিদিনের বাজার করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে দেশের প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার গ্রাফকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

এএন