দ্বিতীয় দিনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
দ্বিতীয় দিনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
বৃহস্পতিবার ভোরে বাধা দেওয়া (ইন্টারসেপ্ট করা) ইরানি ড্রোনগুলোর ধ্বংসাবশেষের (শ্র্যাপনেল) পতনের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, তার ছবি বাহরাইন প্রকাশ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি আবারও চরম উত্তেজনাকর রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরী দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান পরপর দ্বিতীয় দিনের মতো একে অপরের ওপর জোরালো সামরিক হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে গত এপ্রিল মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়েছে। 

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) উভয়েই এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইরানে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি, নজরদারি চৌকি এবং রাডার স্টেশনগুলো লক্ষ্য করে এক ঝাঁক আত্মরক্ষামূলক হামলা' চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই অঞ্চলগুলো থেকে মার্কিন সামরিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর হুমকি আসছিল।

এই হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেন। 

ট্রাম্প লিখেন, আমরা গতকাল তাদের ওপর শক্ত আঘাত হেনেছি এবং আজও আমরা তাদের ওপর আরও শক্ত আঘাত হানতে যাচ্ছি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন যে, তেহরান একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য 'প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরান যদি দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে সই না করে, তবে এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ , প্রেসিডেন্টের সুরেই কথা বলেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে জানান, ইরানকে একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় আসার সুবর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। ফলশ্রুতিতে, এখন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর বোমা বর্ষণ করা হচ্ছে।

মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরানও বসে থাকেনি। ইরানের প্রধান সামরিক শক্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদ ও ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যাপক আকারে পাল্টা হামলা শুরু করেছে।

ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পরপর দ্বিতীয় দিনের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় হামলাটি চালানো হয়েছে জর্ডানে। আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা জর্ডানের 'মুওয়াফফাক সালতি' বিমান ঘাঁটিতে ,মোট ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা সরাসরি মার্কিন কমান্ড সেন্টারকে আঘাত করেছে। ইরানের দাবি, এই হামলায় বিপুল সংখ্যক মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং সামরিক সুবিধা ধ্বংস হয়েছে। তবে ইরানের এই একতরফা দাবি এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সূত্র বা পেন্টাগন দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এই দুই পরাশক্তির সংঘাতের মাঝে পড়ে চরম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রগুলো।

বাহরাইনের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানী মানামা এবং হামাদ টাউনে বিমান হামলার সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের সতর্ক করা হয়। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ইরানি ড্রোনগুলো প্রতিহত করা হলেও, সেগুলোর খণ্ডবিখণ্ড অংশ বা শার্পনেল  আবাসিক এলাকায় এসে পড়ে। 

এতে বেশ কিছু ঘরবাড়ি এবং যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘটনায় ১১ বছর বয়সী একটি শিশু সামান্য আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। বাহরাইন সরকার ইরানের এই হামলাকে 'পাপপূর্ণ' বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

কুয়েত সামরিক বাহিনী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কুয়েতের আকাশসীমায় প্রবেশ করা বেশ কিছু 'শত্রুভাবাপন্ন আকাশযান' সফলভাবে প্রতিহত করেছে। হামলার সময় নিরাপত্তার স্বার্থে কুয়েত তাদের সম্পূর্ণ আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলে বৃহস্পতিবার ভোরে তা পুনরায় চালু করা হয়।

সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি এই সংঘাতের বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ 'হরমুজ প্রণালী'  সব ধরনের নৌযান চলাচলের জন্য 'সম্পূর্ণরূপে বন্ধ' করে দেওয়া হয়েছে।

এর পরপরই আইআরজিসি দাবি করে, তারা ওই প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখনো হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধের এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ২ শতাংশ বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৯৫ মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিটি প্রাথমিকভাবে মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য কার্যকর করার কথা থাকলেও, দুই পক্ষই বড় কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে ছোটখাটো সংঘর্ষের মাধ্যমে এটি টিকিয়ে রেখেছিল।

তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা থমকে যায়। চলতি সপ্তাহে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটে, যার পেছনে ইরানের হাত রয়েছে বলে ওয়াশিংটন সরাসরি অভিযোগ তোলে। এই ঘটনার পর থেকেই মূলত সংঘাতের নতুন এই পর্ব শুরু হয়, যা এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ,মার্কিন হুমকির মুখে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন বলেছেন, ইরান যেকোনো ধরনের চাপ বা হুমকির বিরুদ্ধে শক্তভাবে রুখে দাঁড়াবে।

পাশাপাশি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে হামলা চালাচ্ছে। এই ধরনের 'পরস্পরবিরোধী বার্তা' কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য দিন দিন আরও গভীর সংকটের দিকে নিমজ্জিত হচ্ছে।

এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তির বর্তমান করুণ দশা উল্লেখ করে তিনি এটিকে 'লেসার-ফায়ার' বা মৃদু যুদ্ধাবস্থা বলে অভিহিত করেন। 

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আমাদের এই মৃদু যুদ্ধাবস্থাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি যেকোনো মুহূর্তে 'ফুল-ফায়ার' বা পূর্ণাঙ্গ প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সমস্ত পক্ষকে অবশ্যই বাহানা ও হামলা বন্ধ করে একটি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে আসতে হবে।

এএন