রাজধানী তেহরানে শুরু হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শোভাযাত্রা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই শোকযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতীয় সংহতি, রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রতিশোধের অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সোমবার (৬ জুলাই) সকালে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স থেকে ১২ ঘণ্টাব্যাপী শোকযাত্রা শুরু হয়। এর আগে টানা দুই দিন সেখানে খামেনির মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শোকযাত্রায় অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে লাখো মানুষ জড়ো হন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধে প্রথম দিনেই বিমান হামলায় নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি প্রায় ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু দেশটির জন্য বড় ধাক্কা হলেও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র আরও সুসংগঠিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ভোর থেকেই তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় কালো পোশাক পরিহিত মানুষের ঢল নামে। ইমাম হোসেন স্কয়ারে সমবেত শোকাহত মানুষ বুক চাপড়ে বিলাপ করেন এবং প্রয়াত নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। শোকযাত্রার বিভিন্ন অংশে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সামরিক কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন।
তবে এই সমাবেশ কেবল শোক প্রকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকায় আগুন দেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবিসংবলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড বহন করেন।
প্ল্যাকার্ডে প্রতিশোধের বার্তাও দেখা যায়। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে বলেন, খামেনির হত্যার জবাব দেওয়া হবে এবং এ ঘটনার জন্য দায়ীদের মূল্য দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। প্রথমত, এটি ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক। দ্বিতীয়ত, লাখো মানুষের উপস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সংহতির বহিঃপ্রকাশ। তৃতীয়ত, নতুন নেতৃত্ব দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির দায়িত্ব দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর যৌথ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে, খামেনির বিরুদ্ধে হামলা ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশলের অংশ। এর জবাবে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আরও জোরদার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, খামেনির বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইরানের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নতুন নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কৌশল ও অবস্থানেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। তেহরান থেকে উচ্চারিত প্রতিশোধের বার্তা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এম জি
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন