সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসহ কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে সংবিধানে পুনরায় গণভোট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
আপিল বিভাগের এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোচিত কয়েকটি বিধানের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নিষ্পত্তি হলো। রায়ের পর আইনজীবীরা বলেন, এর ফলে সংবিধানে গণভোট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হওয়ার পথ সুগম হয়েছে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ কয়েকটি বিধানকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে সংবিধানে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল খারিজ করে সর্বোচ্চ আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
রায় ঘোষণার পর ড. শরীফ ভূঁইয়া ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির একে একটি ‘ঐতিহাসিক রায়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
এর আগে বুধবার (৮ জুলাই) টানা তিন দিনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য ৯ জুলাই দিন নির্ধারণ করেন। ওই শুনানিতেও রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং রিটকারীদের পক্ষে ড. শরীফ ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
এর আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। সে সময় আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।
গত বছরের ৩ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করা হয়। রিটকারী সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে এ আবেদন করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। আবেদনে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন বাতিলেরও দাবি জানানো হয়।
এর আগে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিধানকে সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করেন। তবে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল না করে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ এবং তা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। আদালতের মতে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পর্কে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়।
হাইকোর্ট আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। এজন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হয়।
একই রায়ে সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি আদালত বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তার সবগুলো বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ আইন অনুযায়ী জনগণের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে।
গণভোট প্রসঙ্গে আদালত বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারা বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০-এ উন্নীত করাসহ সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন