পরিকল্পনা উপদেষ্টা

শিক্ষায় পচন গভীরে, কমিশন করে নয় মূল থেকে সংস্কার দরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৫, ০৩:৩৫ পিএম
শিক্ষায় পচন গভীরে, কমিশন করে নয় মূল থেকে সংস্কার দরকার

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কেবল নতুন একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করলেই সমাধান আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। 

তার মতে, শিক্ষায় যে পচন ও দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, তা এখন কাঠামোগত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে; তাই আগে ভিত্তি মজবুত না করলে কমিশন করে কোনো ফল মিলবে না।

বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ইউথ পারসপেকটিভস অন সোশ্যাল প্রগেস: গ্রাসরুটস, নেটওয়ার্কস অ্যান্ড লিডারশিপ ভয়েসেস’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

সম্মেলনের আয়োজন করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার এমন অবস্থা যে কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে একটি কমিশন গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষায় মৌলিক পর্যায়ে এতটা পচন ধরেছে যে আগে সেই জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেছে দেশের ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকবিহীন অবস্থায় আছে। একটি কমিশন বসিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট সমাধান সম্ভব নয়। কয়েকজন মানুষকে ওপরে বসিয়ে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভালো করার দায়িত্ব দেওয়া তাদের জন্যও বিব্রতকর হতো।’

বাংলাদেশে ইতিমধ্যে তিনটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছ এ প্রসঙ্গ টেনে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রশ্ন রাখেন, আগের কমিশনগুলোর প্রতিবেদনে অনেক ভালো প্রস্তাবনা ছিল। সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি, অথচ নতুন কমিশনের কথা উঠছে কেন?

তিনি মনে করেন, নীতিনির্ধারকদের উচিত পুরোনো কমিশনের সুপারিশগুলো যাচাই করে বাস্তবায়নে যাওয়া, নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু না করা।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা তরুণদের বর্তমান মানসিক অবস্থাকেও বড় একটি সামাজিক সংকেত হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে যে সহিংসতা ও প্রিয়জন হারানোর অভিজ্ঞতা তরুণদের হয়েছে, তা তাদের মনে গভীর অস্থিরতা তৈরি করেছে। তারা দেশ নিয়ে কিছু করতে চায়, কিন্তু দিক-নির্দেশনার অভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রবীণ ও অভিজ্ঞ প্রজন্মের সহযোগিতা এখন অপরিহার্য। তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে সমাজ ও সরকার উভয়ের সমন্বিত সহায়তা দরকার।

তরুণদের মধ্যে আন্দোলনের ধারায় পরিবর্তন এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একদিকে মহাসড়ক অবরোধের মতো চাপ সৃষ্টির ধারা এখনো আছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বিব্রতকর। তবে ইতিবাচক দিক হলো, গাড়ি ভাঙচুর বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সংস্কৃতি বিদায় নিয়েছে। আন্দোলন এখন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ।

তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তনই তরুণদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিপক্বতার ইঙ্গিত বহন করে।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। এটি একটি ‘ইয়ুথ পাওয়ার’ বা জনসংখ্যাগত সুযোগ যা গত ১৫ বছর ধরে তৈরি হয়েছে এবং আরও ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সময়ের মধ্যেই তরুণদের নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, নইলে এই শক্তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তরুণরা যদি নিজেদের তৈরি করতে পারে, তবে তারা বাংলাদেশকেও বদলে দিতে পারবে।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, শিক্ষা কমিশন নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ। শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও গবেষণা সংস্কৃতি জোরদার এসব ক্ষেত্রেই এখন সংস্কার দরকার।

তিনি বলেন, শিক্ষার পচন একদিনে তৈরি হয়নি, একদিনে দূরও হবে না। তবে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও সততার সঙ্গে কাজ করলে এর পরিবর্তন সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য কেবল একটি প্রশাসনিক মন্তব্য নয়; এটি পুরো শিক্ষা নীতির দিকনির্দেশনা।

তারা মনে করেন, শিক্ষা কমিশন গঠনকে বারবার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো অবহেলিতই থেকে গেছে।

একজন শিক্ষা বিশ্লেষক বলেন, কমিশন গঠন মানে হচ্ছে সময় নেওয়া, কিন্তু সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানো। আসলে প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, নৈতিক শিক্ষায় জোর, এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তার বক্তব্যে তরুণ ও প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে ‘সহযোগিতা ও সংলাপের সেতুবন্ধন’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

তার মতে, প্রবীণরা তরুণদের দিকনির্দেশনা দেবেন, আর তরুণরা তাদের কর্মশক্তি ও উদ্ভাবন দিয়ে সমাজকে এগিয়ে নেবে। এভাবে প্রজন্মের এই মিলনই হতে পারে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রকৃত চাবিকাঠি।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় এক বাস্তবিক আহ্বান সমস্যা শনাক্ত না করে সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষায় সংস্কারের সূচনা হতে হবে ভিতর থেকে, নীতিগত সিদ্ধান্তে নয় বরং নৈতিকতা, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের পুনরুজ্জীবনে।

তিনি বলেন, কাগজে-কলমে পরিকল্পনা নয়, বাস্তব পরিবর্তন দরকার। শিক্ষার ভিত ঠিক না করলে কমিশন করে লাভ হবে না।

তার এই মন্তব্যের মধ্যেই ফুটে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় শিক্ষা হবে মূল চালিকাশক্তি, যদি তা প্রকৃতভাবে সংস্কৃত হয়, কমিশনের কাগজে নয় বরং বাস্তব জীবনে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, শিক্ষাব্যবস্থার পচন এমন গভীর যে কেবল কমিশন গঠন করে এর সমাধান সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, পুরোনো শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা, এবং তরুণদের মানসিক শক্তি কাজে লাগানোই এখন জরুরি।

তার মতে, কমিশনের চেয়ে বড় প্রয়োজন ‘ভিত্তিমূল সংস্কার ও প্রজন্মের নেতৃত্বের সেতুবন্ধন।’

ইএইচ