- ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষকদের কাছে ২৪ লাখ মেট্রিক টন সার সফলভাবে বিতরণ করা হয়েছে
- নিজস্ব খামার ও চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে প্রায় ২,০০০ মেট্রিক টন পাটবীজ উৎপাদন করছে
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তি ও প্রাণকেন্দ্র হলো কৃষি। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্যবিমোচন এবং টেকসই আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার বিকাশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) দীর্ঘ দিন ধরে এক অনন্য ও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে। মানসম্মত কৃষি উপকরণ যেমন- উচ্চফলনশীল বীজ ও সুষম সার উৎপাদন, সংগ্রহ, টেকসই সংরক্ষণ ও সুষম বিতরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেচের জন্য ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির সুষ্ঠু ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংস্থাটি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।
সমপ্রতি সংস্থার চেয়ারম্যান, অতিরিক্ত সচিব মো. আজিজুল ইসলামের গতিশীল নেতৃত্ব, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং কঠোর প্রশাসনিক তদারকিতে বিএডিসির সার্বিক কর্মকাণ্ডে অভূতপূর্ব গতি, নতুন কর্মউদ্দীপনা এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও যে কোনো প্রশাসনিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে বিএডিসির অফিসার, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী ও কর্মচারীরা এখন একযোগে একটি সুসংগঠিত দলের মতো কাজ করে যাচ্ছেন।
বিশেষ করে সার বিতরণ ব্যবস্থায় কৃষকদের যেন বিন্দুমাত্র হয়রানি না হয় এবং প্রতিটি প্রান্তিক কৃষক যেন সঠিক সময়ে সুষম সার পান, তা নিশ্চিত করতে চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মীদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় এনেছেন। সংস্থার এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সুফল এখন পাচ্ছেন দেশের প্রতিটি প্রান্তের কৃষকরা।
কৃষি খাতের মূল ভিত্তি ও সফলতার প্রথম শর্ত হলো মানসম্মত বীজ। ‘ভালো বীজে ভালো ফসল’ এই বাস্তবতাকে মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে বিএডিসির বীজ ও সার উইংয়ের কৃষিবিদ এবং উদ্যান বিশেষজ্ঞরা দিনরাত কাজ করছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব মোকাবিলায় দেশের কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বিএডিসির কৃষিবিদরা। বিএডিসি বর্তমানে ধান, গম, ভুট্টা, পাট, আলু, তৈলবীজ ও শাকসবজির উন্নত এবং প্রতিকূলতা সহনশীল (যেমন- লবণাক্ততা, খরা ও জলমগ্নতা সহনশীল) জাতের বীজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবিত আধুনিক ও প্রতিকূলতা সহনশীল জাতের প্রজনন বীজ সংগ্রহ করে নিজস্ব ‘কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স’ (চুক্তিভিত্তিক চাষি) এবং বীজ বর্ধন খামারের মাধ্যমে মানসম্মত ভিত্তি ও প্রত্যায়িত বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনে বীজের পাশাপাশি সুষম সারের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে সার না পৌঁছালে সম্পূর্ণ ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। গত অর্থবছরে ইউরিয়া ব্যতীত অন্যান্য সারের মোট আমদানি ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন।
অত্যন্ত দক্ষ ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে মোট ২৪ লাখ মেট্রিক টন সার সফলভাবে বিতরণ করা হয়েছে। সার বিতরণে কৃত্রিম সংকট বা অসাধু উপায় রোধ করতে ডিজিটাল মনিটরিং ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বিএডিসি বর্তমানে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাটের গৌরব ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় প্রথমবারের মতো বিএডিসি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের বিপুল পরিমাণ পাটবীজের চাহিদা দেশীয় উৎস থেকে মেটানোর লক্ষ্যে আগামী চার বছরের মধ্যে পাটবীজ উৎপাদনে একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিএডিসি। বর্তমানে বিএডিসি নিজস্ব খামার ও চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে প্রায় ২,০০০ মেট্রিক টন পাটবীজ উৎপাদন করছে। নতুন এই মেগা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে পাটবীজে দেশ পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।
বাংলাদেশে পেঁয়াজের মৌসুমভিত্তিক সংকট নিরসন ও বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে প্রথমবারের মতো বিএডিসি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিএডিসির বিভিন্ন বীজ উৎপাদন খামারে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় আধুনিক কার্যক্রম ইতোমধ্যেই পূর্ণ উদ্যেগে গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য এবং সতেজ ফলমূল ও শাকসবজি বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা ছিল ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ স্বাস্থ্য) মানদণ্ড। এই জটিলতা কাটাতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ঢাকার গাবতলীতে বিএডিসি একটি আধুনিক ‘ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট’ প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক এই প্ল্যান্টটির উদ্বোধন করেছেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কৃষিজাত পণ্যের পোকামাকড় ও ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস হবে, পণ্যের স্থায়িত্ব বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কৃষি পণ্যের সুমান ও রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া থেকে পরিবেশ রক্ষা করতে বিএডিসির ক্ষুদ্রসেচ উইংয়ের প্রকৌশলীরা পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর কৌশল বাস্তবায়ন করছেন। ভূতলে গচ্ছিত পানির ওপর চাপ কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর এখন সর্বোচ্চ জোর দেয়া হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিএডিসি মোট প্রায় ৪৫৫ কিলোমিটার খাল-নালার পুনঃখনন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। মরে যাওয়া খাল ও নালা খননের ফলে বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। প্রসেসিং ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় কমানো হচ্ছে। অকেজো নলকূপ দ্রুত পুনঃস্থাপন করে সচল রাখা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী সৌর শক্তির মাধ্যমে সেচ পাম্প পরিচালনা করে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানো হচ্ছে এবং কৃষকের সেচ খরচ ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রকৌশলীদের এসব সমন্বিত দূরদর্শী প্রচেষ্টার ফলে দেশের হাজার হাজার একর অনাবাদি ও পতিত জমি এখন সেচ সুবিধার আওতায় এসে বহুমুখী ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
একটি সরকারি সংস্থার নিরবচ্ছিন্ন সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো এর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা। বিএডিসিতে কর্মরত প্রশাসনিক ও হিসাবরক্ষণ অফিসাররা সংস্থার বিশাল কর্মীবাহিনীকে সুসংগঠিত রাখা এবং পরিচালনগত স্বচ্ছতা নিশ্চিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন ও পদোন্নতি, দক্ষ কর্মীদের সময়োপযোগী পদোন্নতি এবং সুষ্ঠু পদায়ন নীতি অনুসরণের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্পৃহা, পেশাদারিত্ব ও আনুগত্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে ই-টেন্ডারিং এবং সব ধরনের ক্রয় প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন হচ্ছে। অডিট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
বিএডিসির পরিকল্পনা বিভাগ দেশের বাস্তব প্রয়োজন মাথায় রেখে সময়োপযোগী কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন করছে এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করার ফলে সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ হয়েছে। বিএডিসির বর্তমান চেয়ারম্যান, অতিরিক্ত সচিব মো. আজিজুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সংস্থায় প্রশাসনিক গতিশীলতা, নতুন উদ্দীপনা ও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। কর্মকর্তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং যে কোনো ধরনের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে তুলতে তিনি নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ও পর্যালোচনামূলক সভা পরিচালনা করছেন।
কৃষকের সার পাওয়া নিয়ে অতীতে যে অনিশ্চয়তা বা হয়রানির অভিযোগ থাকত, তা দূর করতে চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছেন। বিএডিসির সার বিতরণ ব্যবস্থায় কৃষকরা যাতে কোনোভাবেই কোনো হয়রানি বা কৃত্রিম সংকটের শিকার না হন, সে লক্ষ্যে চেয়ারম্যান তার অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মীদের নিয়মিত জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে পরিচালনা করছেন।
সার বিতরণের নিশ্চয়তা, কৃষক যাতে সঠিক সময়ে, নির্ধারিত মূল্যে এবং নির্বিঘ্নে সঠিক পরিমাণের সার পান- তা নিশ্চিত করাই বিএডিসি প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। বিএডিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এখন কৃষকরাসহ যে কোনো নাগরিক বীজ, সার ও সেচ সংক্রান্ত সেবার যাবতীয় তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা খুব সহজেই ডিজিটাল উপায়ে লাভ করতে পারছেন।
বিএডিসি হলো দেশের কৃষি ও কৃষকের প্রাণকেন্দ্র। বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আমাদের সব স্তরের অফিসার ও প্রকৌশলীরা স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন, যেন প্রতিটি প্রান্তিক কৃষক সময়মতো সার, উন্নত বীজ ও সেচ সুবিধা পান এবং সার বিতরণে কৃষকের একটি টাকা বা এক মুহূর্ত সময়ও যেন অপচয় না হয়।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উন্নত ও সমৃদ্ধ অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিএডিসির ভূমিকা অপরিসীম। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে বিএডিসি তাদের তথ্যবহুল ওয়েবসাইট ও আধুনিক ডাটাবেজের মাধ্যমে কৃষক ও অন্যান্য অংশীদারদের তথ্য ও সেবা প্রদান কার্যক্রমকে বহুগুণ সহজতর করেছে।
বীজ উৎপাদন ও সার বিতরণ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে ফসলের জমিতে উন্নত সেচ নিশ্চিত করার যে সুসমন্বিত শৃঙ্খল বিএডিসি গড়ে তুলেছে, তা দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করছে।
সংস্থার চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলামের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, জিরো-টলারেন্স নীতিভিত্তিক পরিচালনা পদ্ধতি, কর্মীদের জবাবদিহিতা এবং অফিসারদের নিরলস পরিশ্রমে বিএডিসি আজ একটি দৃষ্টান্তমূলক, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য সরকারি আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিএডিসির কর্মকর্তাদের এই ধারাবাহিক নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বজায় থাকলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি অর্থনীতির সার্বিক রূপান্তর অনেকটাই সহজ ও নিশ্চিত হবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন