মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাঠানো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যায় গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকারি কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মূল ও প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক গল্প-কাহিনী বেশি ফেঁদেছে, যা সরকারের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বুধবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আদ-দ্বীন হাসপাতালের পাঠানো জবাব নিয়ে সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের কথা পরিষ্কার করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে জবাব দিয়েছে তা আমি নিজে বিস্তারিত পড়েছি। তারা চার থেকে পাঁচ পৃষ্ঠা জুড়ে অনেক লম্বা ব্যাখ্যা লিখেছে, তবে তার পুরোটাই অস্পষ্ট এবং দায় এড়ানোর চেষ্টা। সেখানে আসল ঘটনার প্রয়োজনীয় তথ্য না দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ও মনগড়া কথাবার্তা অনেক বেশি লেখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আজ মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই বিশেষ বৈঠকের পর হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক কী ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আদ-দ্বীন হাসপাতালের ভোগ বা অস্পষ্ট জবাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে মোটেও সন্তুষ্ট নয়, তা মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন।
ভয়াবহ এই ঘটনার পটভূমি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত ২৭ মে ভোররাতে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ছয়টি নবজাতক শিশু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একে একে মারা যায়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত চরম অব্যবস্থাপনা এবং ওই রাতে দায়িত্বে থাকা কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের মারাত্মক গাফিলতির একাধিক প্রমাণ উঠে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, যে ওয়ার্ডটিতে শিশুদের রাখা হয়েছিল সেটি মূলত নবজাতক ও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের নিবিড় চিকিৎসার জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের কোনো সুব্যবস্থা ছিল না এবং ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা এসি ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল ও অনিয়মিত।
কমিটির তদন্তে আরও একটি ভয়ংকর দিক উঠে আসে যে ওই মুমূর্ষু অবস্থায় ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। শিশুদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ার পরও সময়মতো কোনো জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের দাবি নাকচ করে বলা হয়, জন্মের পর প্রতিটি নবজাতকের শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুস্থ ছিল। প্রসব-পরবর্তী কোনো জটিলতা না থাকায় তাদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেটরের কোনো প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। মূলত হাসপাতালের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, তদারকির চরম অভাব, প্রশাসনিক ত্রুটি এবং হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতির পর যথাযথ জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণে অবহেলার কারণেই এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ৪ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসানের সই করা এক চিঠির মাধ্যমে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শোকজ করা হয়েছিল।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন