দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত সুখবর নিয়ে এলো প্রতিবেশী দেশ ভারত। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আজ বৃহস্পতিবার বহুল প্রতীক্ষিত ‘পর্যটন ভিসা’ পুনরায় চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।
আগামী ২৮ জুন থেকেই বাংলাদেশিরা আবারও ভারতের পর্যটন ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং ভিসা সেন্টারের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হবে। দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে পুনরায় স্বাভাবিক এবং গতিশীল করার জোরালো চেষ্টার অংশ হিসেবেই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান হাইকমিশনার।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (IVAC) আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারত সরকার তাদের ভিসা কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণ স্থগিত করে দিয়েছিল।
জরুরি চিকিৎসা এবং সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ দুই বছরের মাথায় এসে ভারতের এই পর্যটন ভিসা চালুর সিদ্ধান্ত দুই দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে এবং স্থবির হয়ে থাকা সম্পর্কে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পরিচয়পত্র পেশ ও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ
বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। পরিচয়পত্র পেশের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে তাঁর কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।
বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎকালে দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যকার যোগাযোগ বা ‘পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট’ পুনরুদ্ধার করা যে তাঁর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার, তা তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে ব্যক্ত করেন। পরিচয়পত্র পেশের পরপরই ভিসা চালুর মতো এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত সরকার বাংলাদেশের সাথে চলমান শীতল সম্পর্ক ভাঙতে এবং নতুন অন্তর্বর্তীকালীন ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে কতটা আন্তরিক।
পাঁচ প্রধান বিভাগীয় শহরের ভিসা সেন্টারে একযোগে কাজ শুরু
সংবাদ সম্মেলনে হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানান, আগামী ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান বিভাগীয় শহরের ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (IVAC) থেকে একযোগে পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ এবং প্রক্রিয়াকরণ শুরু হবে। শহরগুলো হলো- ঢাকা (যমুনা ফিউচার পার্ক ও অন্যান্য কেন্দ্র), রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা।
হাইকমিশনার তাঁর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমি যখন গত ১২ জুন সড়কপথে বেনাপোল সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে আসছিলাম, তখনই সীমান্তের দুই পাড়ের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভিসার বিষয়টি বারবার উঠেছিল। আমি নিজে স্বচক্ষে দেখেছি এবং উপলব্ধি করেছি যে, বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভারতের ভিসা কতটা জরুরি এবং সংবেদনশীল একটি বিষয়।
সাধারণ মানুষের যাতায়াত, আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করা এবং দুই দেশের মেলবন্ধনের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু করা অত্যন্ত দরকার ছিল। তাই দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই আমরা এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি দেশবাসীর সামনে নিয়ে এসেছি।”
বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে এবারই প্রথম ভারত সরকার কোনো পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন ঝানু এবং জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে ভারত সরকার সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি বিদায়ী পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
কূটনৈতিক মহলে এই ব্যতিক্রমী নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাজনীতিকের হাতে বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পেছনে দিল্লির সুদূরপ্রসারী কৌশল রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক বা প্রথাগত কূটনৈতিক প্রোটোকলের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের জটিল ও সংবেদনশীল দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধান করাই দীনেশ ত্রিবেদীর প্রধান লক্ষ্য।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের পালস বা আবেগ বোঝার ক্ষেত্রে একজন রাজনীতিবিদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে- দিল্লির এই চিন্তারই প্রতিফলন দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী অচলাবস্থা ও দুই বছরের ভোগান্তি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণ-অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তার অজুহাতে ভারত সরকার বাংলাদেশে তাদের সবকটি ভিসা সেন্টারের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং ভিসা সেন্টারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর সীমিত পরিসরে কেবল ‘মেডিকেল ভিসা’ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্টুডেন্ট ভিসা’ চালু করা হয়েছিল। তবে সাধারণ মানুষ যারা ভ্রমণ, ব্যবসা বা আত্মীয়দের সাথে দেখা করার জন্য যেতে চাইতেন, তাদের আবেদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল।
এই দীর্ঘ দুই বছরে দুই দেশের পর্যটন খাত, বিশেষ করে ভারতের চিকিৎসা পর্যটন, কলকাতার শপিং মল ও হোটেল ব্যবসা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। বহু বাংলাদেশি যারা চিকিৎসার ফলোআপের জন্য ভারতে যেতে চেয়েছিলেন, পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকায় তারা চরম বিপাকে পড়েন। আজকের এই ঘোষণার মাধ্যমে সেই দীর্ঘমেয়াদী মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের একটি ইতিবাচক সমাধান হতে যাচ্ছে।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ভিসা নীতি’ সবসময়ই একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। গত দুই বছর ধরে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে যে এক ধরনের দূরত্ব বা ‘কূটনৈতিক শীতলতা’ বজায় ছিল, পর্যটন ভিসা চালুর মাধ্যমে তা কাটাতে চাইছে ভারত।
সড়কপথে আগমন এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবসম্মত কূটনীতি
সাধারণত বিদেশি হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূতরা আকাশপথে বাংলাদেশে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু দীনেশ ত্রিবেদী গত ১২ জুন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমীভাবে সড়কপথে ভারতের পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেন। সীমান্ত দিয়ে আসার এই সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখার একটি সচেতন প্রয়াস।
সীমান্তে সাধারণ যাত্রী, ব্যবসায়ী এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি কথা বলে তিনি বুঝতে পারেন যে, ভিসা বন্ধ থাকার কারণে দুই দেশের মানুষের মধ্যে কী পরিমাণ ক্ষোভ ও হতাশা দানা বেঁধেছে। একজন ঝানু রাজনীতিকের মতো তিনি সেই জনআকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বঙ্গভবনে পরিচয়পত্র পেশ করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে ভিসা চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নিজের কার্যকারিতা ও গতিশীলতার প্রমাণ দিয়েছেন।
জনগণের বন্ধনে নতুন যুগের সূচনা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দুই দেশের সরকারের মধ্যকার কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নয়; এটি মূলত দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা টানাপোড়েন বা ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও, জনগণের মধ্যকার এই যাতায়াত ও আত্মিক সম্পর্ককে দীর্ঘকাল আটকে রাখা সম্ভব নয়- আজকের এই ঘটনাটি আরও একবার সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করল।
ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর এই সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে। ২৮ জুন থেকে যখন ভিসা সেন্টারগুলোর দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে যাবে, তখন তা কেবল পাসপোর্ট-ভিসার সিলমোহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা হবে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে পারস্পরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং গভীর বন্ধুত্বের এক নতুন যুগের সূচনা। বাংলাদেশের মানুষ আশা করে, এই পর্যটন ভিসা চালুর পর দুই দেশের ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ, ডিজিটাল এবং হয়রানিমুক্ত করতে নতুন হাইকমিশনার তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতাকে কাজে লাগাবেন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন