শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বৈঠক

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং, সংগৃহীত ছবি।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

তিনি জানান, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় বেইজিংয়ের গ্রেট হলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে ১৫টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হবে।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সফরসঙ্গীদের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী।

মাহদী আমিন বলেন, শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় একই ভেন্যু গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় স্থান পাবে।

তিনি জানান, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। সফরটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হচ্ছে।

প্রথম ধাপে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে দেশটি সফর করেন তিনি। সেখানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির রাজা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় ধাপে প্রধানমন্ত্রী চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এ অংশ নেন। সম্মেলনে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো, গিনি ও কাজাখস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গেও তার বৈঠক হয়। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গত চার মাসে বাংলাদেশের সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

সফরের তৃতীয় ধাপে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বুধবার বেইজিং পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, লালগালিচা সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয়।

বর্তমানে তিনি বেইজিংয়ের দাওয়তি স্টেট গেস্টহাউজে অবস্থান করছেন। মালয়েশিয়া ও দালিয়ান সফরের মতো এবারও তার সঙ্গে ২৫ সদস্যের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিনিধিদল রয়েছে। এ প্রতিনিধিদলের মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পর্যায়ের ১১ জন সদস্য রয়েছেন।

মাহদী আমিন বলেন, এই সফরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এগিয়ে নেওয়া, চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানো।

বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নৌ-নেভিগেশন প্রসারের বিষয়ে আলোচনা হয়।

এ সময় চীনের পক্ষ থেকে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।

একই দিনে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে চীনের ৮০টি শীর্ষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সেখানে প্রধানমন্ত্রী চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উৎপাদন ও শিল্প খাতের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক, নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

তিনি আরও জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৫ দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্টহাউজে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ওই বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। চীনা পক্ষ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।

এ সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেক রহমানও চীন সফর করেছিলেন। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে চীন সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি শক্তিশালী করেছিলেন।

পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাতবার চীন সফর করে সেই সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করেন।

তিনি আরও জানান, চীন সফরকালে বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তা, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, দীর্ঘ সময় পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে মালয়েশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং চীন সফর করছেন, তা বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি আরও জানান, চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষ হওয়ার পর রাতেই বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করা হবে।

এএন