সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য বা দেশে ফেরার ঘোষণাকে সম্পূর্ণ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘বিবেচনার অযোগ্য’ বলে নাকচ করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত একজন আসামির ভার্চুয়াল বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বক্তব্য সরকারের নীতিগত বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আইনি প্রক্রিয়া ও দ্বিপক্ষীয় বন্দি বিনিময় চুক্তির আলোকেই পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সচল রয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে কূটনৈতিক স্তরে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বক্তব্যের কোনো আইনি বা নীতিগত মূল্য নেই
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব মাধ্যমে তিনি দেশে ফেরার ব্যাপারে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। তবে ঢাকা একে কেবলই একজন দণ্ডিত আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। একজন ব্যক্তি যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল দ্বারা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হন, তখন তার রাজনৈতিক বিবৃতির কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ভিত্তি থাকে না। সরকার তার এসব বক্তব্যকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, অপরাধীকে আইনের মুখোমুখি করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং কোনো ধরনের প্রচারণামূলক বক্তব্য এই মূল লক্ষ্য থেকে রাষ্ট্রকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
বন্দি বিনিময় চুক্তি ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে ঢাকা-নয়াদিল্লি বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সই হওয়া বন্দি বিনিময় চুক্তির (Extradition Treaty) শর্তাবলী উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই আইনি কাঠামোর আওতাতেই শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা ভারতের সঙ্গে সব ধরনের প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা এবং আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, ইতিবাচক অগ্রগতির প্রত্যাশা
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ইস্যু ছাড়াও দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত ও সংবেদনশীল গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিস্তা বা গঙ্গার মতো অভিন্ন নদীর পানি হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন বা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে দুই দেশের কারিগরি ও কূটনৈতিক পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপ ও আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করে। পারস্পরিক সম্মান, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা বিবেচনা করে ভারত দ্রুতই একটি প্রগতিশীল ও গ্রহণযোগ্য অগ্রগতি নিশ্চিত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সার্ক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি
এর আগে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে আঞ্চলিক জোট 'সার্ক' (SAARC) অকার্যকর হয়ে পড়ার বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর এই বিরোধের খেসারত দিতে হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রগুলোকে, যার ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়েছে। আজকেও তিনি আকার ইঙ্গিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক কূটনীতির ওপর জোর দেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রদবদল, পেশাদারিত্বের জয়গান
সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন উইংয়ে যে রদবদল ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, সেটিকে রুটিন কাজের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ একটি স্বাভাবিক এবং চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
মন্ত্রণালয়ের সংস্কার ও পরিবর্তন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও দক্ষতা,রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার্থে এবং কূটনৈতিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত: যোগ্যতা এবং দেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসাকে মাপকাঠি ধরেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই রদবদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা: কোনো ব্যক্তিবিশেষের কারণে যেন রাষ্ট্রীয় নীতি থমকে না থাকে, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়- সেটিই এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারসম্মত। একদিকে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনের মতো সংবেদনশীল দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোকে অত্যন্ত পরিপক্বতার সাথে সচল রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে কূটনৈতিকভাবে পাশ কাটিয়ে মূলত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপরই জোর দিচ্ছে বর্তমান প্রশাসন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন