সেমিকন্ডাক্টর খাতকে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি করতে চায় সরকার

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ১০:০১ পিএম
সেমিকন্ডাক্টর খাতকে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি করতে চায় সরকার

তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দেশের অর্থনীতির পরবর্তী প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর নভোথিয়েটারে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিক্স সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাতের ভবিষ্যৎ নির্মাণ-এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনে দেশ-বিদেশের গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্ভাবকদের অংশগ্রহণে খাতটির সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

বক্তারা বলেন, আধুনিক বিশ্বের প্রায় সব প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, তথ্যকেন্দ্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, স্মার্টফোন, উপগ্রহ এবং শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ-সব ক্ষেত্রেই চিপের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার আগামী কয়েক বছরে ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বাংলাদেশ যদি এই বাজারের একটি ক্ষুদ্র অংশও অর্জন করতে পারে, তবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিতে নতুন বৈচিত্র্য সৃষ্টি হবে।

সরকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, এই খাতের বিকাশে শুধু একটি মন্ত্রণালয় নয়, বরং সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

এ লক্ষ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানো, দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদদের অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো।

বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশে একাধিক নীতিগত সুবিধাও রাখা হয়েছে। শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে কর ও শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যাতে পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও গবেষণার ব্যয় কমে আসে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর নকশা সেবা থেকে অর্জিত রপ্তানি আয়ের জন্য বিশেষ নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তরুণ উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করতে সরকার বছরে ৫ কোটি টাকার প্রারম্ভিক অনুদান চালু করেছে। এছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শুল্কমুক্ত বন্ডেড সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন জীবপ্রযুক্তি ও উচ্চপ্রযুক্তি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

বক্তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও গবেষকদের অভিজ্ঞতা দেশের জন্য বড় সম্পদ। তাঁদের জ্ঞান, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেশের নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্মেলনের প্রদর্শনীতে স্থানীয় উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সেমিকন্ডাক্টর চিপের পরীক্ষামূলক নকশা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবোটিক্স ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, বুদ্ধিমান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং গভীর প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্ভাবন উপস্থাপন করে। এসব উদ্ভাবন দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সমিতি, ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং সিলিকন রিভার বাংলাদেশ কর্মসূচি।

উদ্বোধনী অধিবেশনে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সমিতির সভাপতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব এবং পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বক্তব্য দেন।

তাঁরা বলেন, উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশকে জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। কম দক্ষ শ্রমনির্ভর উৎপাদনের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্য ও সেবা খাতে সক্ষমতা অর্জনই হবে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ক্রিস্টি ফেলোশিপ গবেষণা সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হবে। এতে তরুণ গবেষকরা সেমিকন্ডাক্টর, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং বর্তনী নকশা বিষয়ে তাঁদের গবেষণা উপস্থাপন করবেন। সম্ভাবনাময় গবেষণাগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও অর্থায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বক্তাদের প্রত্যাশা, যথাযথ নীতিগত সহায়তা, দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ শিল্পেও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

এম জি